
শেষ আপডেট: 12 July 2020 18:30
ভুবণেশ্বর প্ল্যানেটোরিয়ামের ডেপুটি ডিরেক্টর পাথানি সামন্ত বলেছেন, প্রায় সাত হাজার পরে ব্রহ্মাণ্ডের হিমশীতল রাজ্য থেকে দিক ভুলে ছুটে এসেছে এমন ধূমকেতু। এতদিন সূর্যোদয়ের আগে উত্তর-পূর্ব আকাশে দেখা দিচ্ছিল নিওওয়াইস। ১৪ জুলাই থেকে উত্তর-পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্তের পরেই তার আগুনে রূপ নিয়ে জ্বলে উঠবে। খালি চোখে দেখা যাবে প্রায় ২০ মিনিট। ভারতের আকাশে অতিথি হয়ে থাকবে টানা ২০ দিন।
২২ জুলাই ঝলসে উঠবে নিওওয়াইসের আগুনে রূপ, ৩০ জুলাই সপ্তর্ষি মণ্ডলের অতিথি হবে
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভারতের আকাশজুড়ে জুলাই থেকে অগস্ট অবধি জ্বলজ্বল করবে এই ধূমকেতু। তার দুই লেজ ভাসিয়ে গোটা উত্তর গোলার্ধ দাপিয়ে বেড়াবে। আগামী ২২-২৩ জুলাই পৃথিবীর মাথার উপর দিয়ে ভেসে যাবে। তখন সে থাকবে পৃথিবীর আরও কাছাকাছি। মাত্র ১০ কোটি কিলোমিটার দূরে। আরও বেশি উজ্জ্বল ও স্পষ্ট দেখা যাবে তার রূপ। রাতের আকাশে আলোর মায়া ছড়িয়ে দিয়ে যাবে নিওওয়াইস। ৩০ জুলাই থেকে তাকে দেখা যাবে সপ্তর্ষি মণ্ডলের কাছে। ৪০ ডিগ্রি অক্ষাংশে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে। জুলাইয়ের শেষ থেকে ধীরে ধীরে তার আগুনে রূপ বর্ণহীন হতে থাকে। ভারতের আকাশ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাবে এই অনাহুত অতিথি। খালি চোখে তখন আর নিওওয়াইসকে দেখা যাবে না। অগস্টের পরে আবার হয়ত সে ফিরে যাবে নিজের দেশে।
পৃথিবীর পিঠে যেন আলোর চাদর, আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন থেকে দেখেছেন নাসার নভশ্চররা
পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের উপরে যেন আলোর রোশনাই। এক ফালি আলোর সমুদ্র যেন ভেসে যাচ্ছে নীল গ্রহকে ঘিরে। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন থেকে নিওওয়াইসের রূপের ছটা দেখে মুগ্ধ নাসার নভশ্চর বব বেনকেন। টুইট করে নিওওয়াইসের এই ছবি তিনি দেখিয়েছেন। বব বলেছেন, যেন মনে হচ্ছে উৎসব হচ্ছে পৃথিবীর পিঠে। আতসবাজি ঝলসে উঠছে। নিস্তব্ধ, নিষ্প্রাণ, শূন্য মহাকাশ যেন আলোর জ্যোৎস্নায় স্নান করেছে।
নাসার জেট প্রপালসন ল্যাবরেটরির টেলিস্কোপ প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর জো ম্যাসিয়েরো বলেছেন, সাত হাজার বছর পরে ফিরে এসেছে দুই লেজের নিওওয়াইস। এক বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষ্মী হতে চলেছে বিশ্ব।
উত্তর ব্রিটেন, ওয়াশিংটনের আকাশে নিওওয়াইসের অস্পষ্ট ঝলক দেখা গেছে। নাসার টেলিস্কোপে ধরা পড়েছে সেই দৃশ্য।
https://twitter.com/AstroBehnken/status/1279880785240227841?ref_src=twsrc%5Etfw%7Ctwcamp%5Etweetembed%7Ctwterm%5E1279880785240227841%7Ctwgr%5E&ref_url=https%3A%2F%2Fwww.indiatoday.in%2Fscience%2Fstory%2Fcomet-neowise-to-be-visible-in-india-check-time-dates-how-to-see-1699810-2020-07-12
https://twitter.com/nasahqphoto/status/1282261050499502084
‘পথভোলা এক পথিক এসেছি’
তার ঠিকানা কেউ জানে না। পরিবার পরিজনেরও খোঁজ নেই। আচমকাই পথ ভুলে চলে এসেছে সৌরমণ্ডলের ঠিকানায়। মার্চ মাসেই এই অনাহুত অতিথির খোঁজ পেয়েছিল ‘ওয়াইল্ড-ফিল্ড ইনফ্রারেড সার্ভে এক্সপ্লোরার’ (WISE) স্পেস টেলিস্কোপ। পৃথিবীর ধারেকাছে হুটহাট চলে আসা গ্রহাণু বা মহাজাগতিক বস্তুকে শনাক্ত করাই এই ওয়াইস স্পেস টেলিস্কোপের কাজ। তার এই নিয়ার-আর্থ অবজেক্ট মিশনেই ধরা দেয় নিওওয়াইস। ধূমকেতু তখন সূর্যের খুব কাছে। প্রায় সাড়ে চার কোটি কিলোমিটারের দূরত্বে।
https://twitter.com/alan_downes_/status/1282097249678430209?ref_src=twsrc%5Etfw%7Ctwcamp%5Etweetembed%7Ctwterm%5E1282097249678430209%7Ctwgr%5E&ref_url=https%3A%2F%2Fwww.indiatoday.in%2Fscience%2Fstory%2Fcomet-neowise-to-be-visible-in-india-check-time-dates-how-to-see-1699810-2020-07-12
বুধের কক্ষপথ থেকেও সূর্যের কাছাকাছি। এত তেজের কারণেই কি না জানা নেই, এখন নিওওয়াইস তার প্রায় উপবৃত্তাকার কক্ষপথ ধরে সরতে সরতে পৃথিবীর দিকেই এগিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অগস্ট অবধি সন্ধের পরে আকাশে দিব্যি দেখা যাবে নিওওয়াইসকে। পৃথিবীর কাছাকাছি থাকার জন্য বেশ লম্বা ছুটি নিয়েই এসেছে সে।
অনাহুত আগন্তুক, কোথায় তার ঠিকানা?
নিওওয়াইসের পরিধি ৩০ কিলোমিটারের কম। এর শরীর তৈরি হয়েছে পাথর, গ্যাস আর বরফ দিয়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সূর্যের কাছাকাছি সৌরবায়ু ও তড়িদাহত সৌরকণাদের সংস্পর্শে এসে এই গ্যাস ও বরফ উবে গিয়ে নতুন পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে। দুটো লেজও গজিয়েছে যার একটি গ্যাসের ও অন্যটির ধুলোর।
কোন তারামণ্ডল থেকে ছুটে এসেছে জানা নেই। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথে তার ঠিকানা ছিল কিনা সেটাও অজানা। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করছেন, কুইপের বেল্ট বা ওরট ক্লাউড (Oort Cloud) থেকেই নতুন অভিযানের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে নিওওয়াইস। এই ওরট ক্লাউড হল সৌরমণ্ডলের থেকে বহু দূরের এক হিমশীতল বরফের রাজ্য। আমাদের সৌরমণ্ডলের বড় বড় গ্রহগুলির পাশে থাকার অধিকার পায়নি যে ছোটখাটো গ্রহাণু বা মহাজাগতিক বস্তুরা, তাদেরই ঠিকানা ওই বরফের দেশে। প্রায় ৪০০-৫০০ কোটি বছর ধরে ওই বরফের দেশে বাস করে ধূমকেতুরা। হিমশীতল জায়গায় থাকায় এদের শরীর তৈরি হয় পাথর, গ্যাস আর বরফ দিয়ে। বিজ্ঞানীরা বলেন, সৌরমণ্ডল যতটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তাকে পরিমাপ করা হয় অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (এইউ) দিয়ে। এর বাইরেও যে ঘন আঁধারে ঢাকা ঠাণ্ডার দেশ রয়েছে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছয় না সে দেশকেই বলে ওরট ক্লাউড। আর এখানেই বাড়ি ধূমকেতুদের। নিওওয়াইসও এই ওরট ক্লাউড থেকেই সূর্য-পৃথিবীর সংসারে চলে এসেছে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের।