
সাক্ষাৎকারে সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে তাঁর। প্রতীকী ছবি।
শেষ আপডেট: 21 August 2024 17:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমরা খুবই গরিব পরিবার। ওকে বড় করতে আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আমাদের মেয়েও ডাক্তার হওয়ার জন্য কঠিন পরিশ্রম করেছিল। দিনরাত এক করে খেটেছিল। ওর একটাই কাজ ছিল পড়া, পড়া, আর পড়া। আর জি করের শিক্ষানবীশ ডাক্তার-ছাত্রীর বাবা ফোনে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেন। ডাক্তারির প্রতি তাঁর মেয়ের অদম্য আকর্ষণ ও ভালোবাসা, মেয়ের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে কী করে পরিবার তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেসব স্মৃতির কথা তুলে ধরেন বাবা।
তিনি বলেন, কিন্তু, একরাতে আমাদের সকলের স্বপ্ন ছত্রখান হয়ে গেল। আমরা ঘরের মেয়েকে কাজ করতে পাঠিয়েছিলাম আর হাসপাতাল আমাদের হাতে ওর দেহ তুলে দিল। আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেল। নৃশংসভাবে নির্যাতন করে খুনের ঘটনায় বাবা বলেন, আমার মেয়ে আর কোনওদিন ফিরবে না জানি। ওর কথা অথবা হাসির আওয়াজ আর কোনওদিন আমাদের কানে ভেসে আসবে না। এখন আমার জীবনের একটাই কাজ হবে, ওকে বিচার দেওয়া। ওর সঙ্গে যে অবিচার হয়েছে, তার সুরাহা করা।
তিনি জানান, তাঁর একমাত্র কন্যার জীবনে একটাই স্বপ্ন ছিল, তা হল ডাক্তার হওয়া। চিকিৎসা কাজে নিজেকে নিয়োগ করা। দেশের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির ১ লক্ষ ৭০ হাজার পদের মধ্যে একটি ছিনিয়ে নিয়েছিল কঠিন পরিশ্রমে। যে পরীক্ষায় প্রতিবছর নিদেনপক্ষে ১০ লক্ষ পড়ুয়া বসেন। পরীক্ষার প্লেসমেন্টে তাঁর মেয়ে কলেজ অফ মেডিসিন এবং কল্যাণীর জেএনএম হাসপাতালে সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা-মা মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য সব সঞ্চয় উগরে দিয়েছিলেন। এসব কথা জানান, দর্জির কাজ করা বাবা।
যেদিন ডাক্তার হওয়ার কথা বাবাকে বলেছিলেন, সাক্ষাৎকারে সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে তাঁর। তিনি বলেন, ও বলল, বাবা ডাক্তার হলে আমি অন্যদের উপকারে লাগব। লোকের চিকিৎসা করব। তুমি কী বলো! আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে, তাই করো। আমরা তোমার পাশে থাকব। আজ দেখুন শেষমেশ কী হল!
ধরা গলাতেই তিনি বলতে থাকেন, হাসপাতাল ও বাড়িতে যাতায়াত করতে ওর শরীরের রক্ত জল হয়ে যেত। তাই আরও খাটাখাটনি করে ওর জন্য গাড়ি কিনব বলে ঠিক করি। প্রথমে ওর সামনে যখন কথাটা পাড়ি, তখন ও আপত্তি করে। ও বলে মাসিক কিস্তি মেটাতে অসুবিধা হবে। আমাদের উপর বাড়তি বোঝা চাপাতে চায়নি ও। কিন্তু যখন বুঝল বাসে করে যাওয়া-আসা করতে আরও কষ্ট হচ্ছে, তখন গাড়ি কিনতে রাজি হয় মেয়ে।
শহরতলির সেই বাড়িতেই আজও তাঁরা থাকেন। পাড়াপড়শির কাছেও ভালো মেয়ে বলে সুখ্যাতি আছে। পুরনো বাড়িটা সামান্য সারানো হয়েছে। যার দরজায় পিতলের নেমপ্লেট সাঁটা রয়েছে। গর্বিত বাবা-মা নিজেদের নাম বসাননি, লেখা রয়েছে ডাঃ...। বাবা আরও বলেন, ও যখন রাস্তায় থাকত তখন আমরা দুশ্চিন্তা করতাম। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে যেই ফোন করত, নিশ্চিন্ত হতাম আমি আর ওর মা। মনে করতাম এবার নিরাপদে আছে। কিন্তু, সেই নিরাপদ স্থানই যে মেয়ের মৃত্যুকূপে পরিণত হবে তা কি দুঃস্বপ্নেও ভেবেছিলেন বাবা-মা!