
শেষ আপডেট: 22 August 2021 06:36
তবে কিছু মানুষ আজও ভাবেন এদের কথা। এদের সঙ্গে সমাজের অদৃশ্য বিভেদ মেটানোর চেষ্টা করছেন অহরহ। দুর্গাপুজো, ভাইফোঁটা, রাখির মতো উৎসবে এদের সামিল করান। তাদের অধিকার পাইয়ে দেওয়ার জন্য লড়াই করেন। এমনই কিছু মানুষের উদ্যোগে শনিবার সোনাগাছি যৌন পল্লীতে অনুষ্ঠিত হল বন্ধনহীন রাখি বন্ধন উৎসব।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম বাধা ছক ভেঙে এই রাখি বন্ধন অনুষ্ঠানকে সমাজের সব মানুষের মধ্যে এনে ফেলেন। তিনিই বিভেদহীন বন্ধনের বার্তা দেন। শুধু ভাই-বোনের মধ্যে হয়, সম্প্রীতি সৃষ্টির উৎসব হিসেবে সমাজের সবাইকে এক জোট করেন তিনি। সেখানে ছেলে, মেয়ে, উঁচু নিচু কোনো ভেদাভেদ ছিল না। সেই মন্ত্রকেই পাথেয় করে এদিন সোনাগাছির যৌন পল্লীতে এই বন্ধনের উৎসব পালিত হয়। যৌন কর্মী, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও উপস্থিত হন এই উৎসবে। নিজেদের মধ্যে এক বিভেদহীন বন্ধন তৈরি করেন।
একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে দেন সানি, সুদীপারা। সেই মুহূর্তে ওদের চোখে মুখে খুশির হাসি ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। এই খুশিই সবসময় দেখতে চান উদ্যোক্তারা। "আমি একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। আমাদেরকে নিয়ে এমন অনুষ্ঠান ভাবা হয়েছে যা দেখে খুব ভালো লাগছে। এইরকম অন্য কোথাও হতে দেখিনি। এই অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে কত খুশি হয়েছি তা বলে বোঝানো যাবে না।" জানালেন সানি মুখার্জি।
সেই একই সুর শোনা গেল আর এক রূপান্তরকামী সুদীপা বাকুলির গলায়। তিনি বলেন, "আমাদের মতো রূপান্তরকামীদের নিয়ে এমন রাখি বন্ধন উৎসব হচ্ছে দেখে আমি খুব খুশি।" সবচেয়ে বড় কথা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, সেই বিষয় দেখেই সবচেয়ে খুশি তাঁরা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও সমাজে তাঁদের গ্ৰহণযোগ্যতা নিয়ে সবসময় প্রশ্ন থাকে।
হাওড়ার কল্যাণপল্লী দুর্গোৎসব ক্লাবের উদ্যোগে এদিনের এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। তাদের পাশে ছিল বাগবাজার লায়ন্স ক্লাব ও দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি। এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে বিভেদহীন বন্ধনের বার্তাই দিতে চাইলেন হাওড়ার কল্যানপল্লী দুর্গোৎসব ক্লাব।
এই ক্লাবের অন্যতম সদস্য আত্রেয়ী দে'র কথায়, "এই অনুষ্ঠান করতে পেরে আনন্দিত। এখনও সমাজের চোখে যৌন কর্মীরা অন্ধকারে রয়েছেন। তাঁরাও অন্ধকার থেকে বাইরে আসুক।" সেই কথাই বললেন লায়েন্স ক্লাবের সদস্য কনক কুমার। তিনি বলেন, "ঘর চালানো থেকে বাচ্চা মানুষ, এমনকি সংসার চালাতে রোজগারও করছেন নারীরা। আর এখানকার নারীরা সমাজের সব কলঙ্ক পরিষ্কার করেন। সমাজের সমতুল্যতা বজায় রাখেন। তাই এদের সঙ্গে এই উৎসবে যোগ দিতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়।"
সমাজসেবী তথা দুর্বারের অন্যতম সদস্য মহেশ্বেতা মুখার্জির কথায়, "যৌন কর্মী, রূপান্তরকামী ও সমাজের মূল স্রোতের মানুষরা এদিনের অনুষ্ঠানে একে অপরকে রাখি পরিয়ে যে বন্ধনের সৃষ্টি করলেন তা অবিস্মরণীয়। এ এক বিভেদহীন বন্ধনের সৃষ্টি। এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই।" সেই ভেদাভেদহীন সমাজের কথাই শোনা গেল দুর্বারের সভাপতি কাজল বোসের গলায়। তিনি বলেন, "আমরা এক ধাপ করে এমন জায়গায় যাচ্ছি, একদিন এমন আসবে আমাদেরকেও সমাজের কেউ আলাদা চোখে দেখবে না।"
অন্যদিকে চিকিৎসক অশোক কুমার সিং এই অনুষ্ঠানে এসে যৌন কর্মীদের থেকে রাখি পরে খুশি। যেভাবে আজকের অনুষ্ঠান করা হল সবাইকে নিয়ে তাতে বলাই চলে এটি 'বিভেদহীন বন্ধন'। এমনকি অনুষ্ঠানের শেষে সকলের মধ্যে রুটি-তরকারি-মিষ্টি বিলি করা হল। সবেতেই ছিল এক সম্প্রীতির বার্তা।