
শেষ আপডেট: 23 July 2023 09:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'শেষ কবে বাড়ি এসেছিলি?'
উত্তর নেই। ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে। ত্রাণ শিবিরে (Raigad landslide) তখন হইচই, মাঝে মাঝেই কান্নার রোল উঠছে। ৯ বছরের ছেলেটাকে যদিও সেসবের কিছুই স্পর্শ করছে না। কেনই বা তাকে এখানে আনা হল, তা সে জানে না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেই কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে। সে এখনও জানেই না, নিয়তি কী দুঃসহ, দিশাহীন ভবিষ্যত রচনা করেছে তার জন্য (Tragic story)।
গায়ে টি-শার্ট, নীল ঢোলা ফুলপ্যান্ট। টি-শার্টে আবার সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি। ক্লাস ফোরের ছাত্র বসন্ত পিরকাদের ঠিকানা ছিল ইরশালওয়াড়ি গ্রাম। ছিল, কারণ সেই বাড়ি আর নেই। গত বৃহস্পতিবার নাগাড়ে বৃষ্টির জেরে আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ধস নেমেছিল মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার খালাপুর তহশিলের ইরশালওয়াড়ি গ্রামে। ভোররাতে গ্রামবাসীরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তছনছ হয়ে গিয়েছিল সবকিছু। ধসের তলায় চাপা পড়ে যায় ২০টি বাড়ি। অন্তত ১০০ জন আটকা পড়েছিলেন ধ্বংসস্তূপ আর কাদার তলায়। প্রাথমিকভাবে ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু পরে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ে।
ভয়ঙ্কর সেই ধসে মৃতদের তালিকায় নাম রয়েছে বসন্তের পরিবারের ১২ জনের। তবে শুরুতেই জানা যায়নি যে তাঁরা মারা গেছেন। কিন্তু উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ার পর এক এক করে তাঁদের প্রাণহীন দেহের খোঁজ মেলে।
আসলে সে ইরশালওয়াড়িতে থাকতই না। পড়াশোনা করার জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল মাঙ্গাওয়াড়ি আশ্রমশালায়। গত চার বছর ধরে সেখানেই আবাসিক হিসেবে পড়াশোনা করছিল সে। প্রতিবছর গরমের ছুটিতে যখন ক্লাস বন্ধ থাকত তখন বাড়িতে আসত ছোট্ট বসন্ত। বছরে ওই একবারই বাড়ির লোকজনের সঙ্গে দেখা হত তার। ১ মাস সেখানে কাটিয়ে স্কুল খুলে গেলে ফের মাঙ্গাওয়াড়িতে ফিরে যেত সে। ৯ বছরের বসন্তের বাড়ির কথা সব ভাল করে মনেও নেই। তাই ত্রাণ শিবিরের লোকজন যখন তাকে বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করছিল, তখন সে শুধুই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। কোনও কথা বলছিল না। বোবার মতো ঘুরে ঘুরে ত্রাণ বিলি করা দেখছিল শুধু।
বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর বসন্তকে ত্রান শিবিরে নিয়ে এসেছিল তার কাকিমা মাই কামব্দে। তাঁর বাড়ি পানভেলে। ভয়ঙ্কর সেই ধসের পর শনিবার নাদাল গ্রামের শ্রীক্ষেত্র পঞ্চায়তন মন্দিরে অস্থায়ী ত্রাণ শিবির তৈরি করে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছিল গৃহহারা ৭৩ জনকে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর একটি দল গ্রামে গিয়ে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছিল। সেখান থেকে পাওয়া নগদ টাকা, গয়না এবং অন্যান্য দামি জিনিসপত্র স্থানীয় থানায় জমা দিচ্ছিল তারা। পরে ত্রাণ শিবিরের লোকজন ঠিকঠাক প্রমাণ দেখাতে পারলে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল সেগুলি।
যদিও মাই কামব্দের দাবি, তাঁর পরিবারের টাকা এবং সোনা যা পাওয়া গিয়েছিল সেসব কিছুই দেওয়া হয়নি তাঁকে। উল্টে বদলাপুর থেকে এক আত্মীয় এসে নাকি নিজের বলে দাবি করে শুক্রবার সন্ধ্যায় সেসব নিয়ে চলে গেছেন বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁদের পরিবারের ৩ টি বাইকেরও সন্ধান মেলেনি বলে জানিয়েছেন তিনি। কামব্দের দাবি, কাছাকাছি কোনও ব্যাঙ্ক না থাকায় বাড়ির সকলে তাঁদের যাবতীয় নগদ টাকা এবং সোনার গয়না বাড়িতেই রাখতেন।
এখন না আছে বাড়ি, না রয়েছেন প্রিয়জনরা। না পেয়েছেন খোয়া যাওয়া টাকা-গয়না। সব হারিয়ে ত্রাণ শিবিরে বসে শুধুই কপাল চাপড়াচ্ছেন কামব্দে। আর বসন্ত? সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে সবটুকু। সে জানে না, তাকে কেন স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা হল এখানে। জানে না, তার বাবা-মা কোথায়। জানে না, সে আবার স্কুলে যেতে পারবে কিনা। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস বোঝার মতো বোধ এখনও তৈরি হয়নি তার।
এল ৫ কোটি, গেল ৫৮ কোটি! অনলাইন জুয়ার ফাঁদে নাগপুরের ব্যবসায়ী