দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব ও লকডাউনের গুরুত্ব কত সেটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই সময়ে। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে সামাজিক দূরত্বের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বিশেষ একটি হিসেবের কথা উল্লেখ করলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের যুগ্ম সচিব লব আগরওয়াল। তিনি বললেন, পারস্পরিক দূরত্ব বিধি যদি মেনে না চলা হয় তাহলে একজন কোভিড-১৯ সংক্রামিতের থেকে কতজন আক্রান্ত হতে পারেন তার একটি গবেষণা করেছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)। এই গবেষণা চালানো হয়েছে
‘আর-নট’ (R Naught/ R0) বা
রিপ্রোডাকশন নম্বরের (Reproduction Number) উপর ভিত্তি করে।
কোভিড-১৯ শুধু নয়, বিশ্বজুড়ে যতরকম সংক্রামক রোগ দেখা দিয়েছে সেইসবের ভয়াবহতা ও ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতাকে এই নম্বর দিয়ে যাচাই করা হয়। ‘আর-নট’ এমন একটা অঙ্কের হিসেব যার দ্বারা বোঝা যায় কোনও ভাইরাস-ঘটিত রোগ মহামারীর পর্যায় যাবে কিনা, আর গেলেও কী পরিমাণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে মানুষের মধ্যে। লব আগরওয়াল এদিন এই ‘আর-নট’ বা রিপ্রোডাকশন নম্বরের হিসেব বুঝিয়ে বললেন, যদি সামাজিক দূরত্ব বা লকডাউন মেনে না চলা হয়, তাহলে একজন কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে ৪০৬ জনকে সংক্রামিত করতে পারেন। আবার যদি লকডাউনের বিধি ৭৫% মেনে চলা হয়, তাহলে দেখা যাবে, একজন আক্রান্তের থেকে একমাসে মাত্র দুই থেকে আড়াইজন সংক্রামিত হচ্ছেন।
https://twitter.com/PIB_India/status/1247472137364856833
কী এই ‘আর-নট’ (R Naught/ R0 Calculation) হিসেব?
সহজভাবে বলতে গেলে অঙ্কের একটা হিসেব। আর-নট মানে রিপ্রোডাকশন নম্বর যার একটা স্কেল থাকে। এই নম্বর বিচার করে বলা যায় কোনও সংক্রামক ব্যাধি মহামারীর পর্যায়ে যেতে পারে কিনা অথবা কোনও সংক্রামক ভাইরাসের রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা কতটা। ভাইরাসের ধরন, সংক্রামক রোগের প্রকৃতি ইত্যাদি বিচার করে এই ‘আর-নট’ নম্বরের একটা স্কেল ঠিক করা হয়। যেমন কোভিড-১৯ সংক্রমণের ‘আর-নট’ স্কেল হল ১.৫ থেকে ৪.০। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস, ২০০৯ সালে এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ও ২০১৪ সালে ইবোলা মহামারীর সময়ও এই ‘আর-নট’ হিসেবের মাধ্যমে সংক্রমণের তীব্রতা যাচাই করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রেও স্থির হয়েছিল একটা মাপকাঠি বা স্কেল।
এই ‘আর-নট’ বা রিপ্রোডাকশন নম্বর দু’রকমের হয়। মারণ ভাইরাস বা ওই জাতীয় প্যাথোজেনের সংক্রমণ যদি মহামারীর পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে সেটা নির্ণয় করা যায় তার
বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর ( basic reproduction number ) দিয়ে। এই হিসেব বলে দেয়, যদি কোনও আক্রান্ত ব্যক্তি অবাধে সমাজিক স্তরে বা কোনও গোষ্ঠীর মধ্যে মেলামেশা চালিয়ে যান, তাহলে সংক্রমণ কী পরিমাণে ছড়িয়ে পড়তে পারে সেই গোষ্ঠীতে। অনেক বড় মাপের হিসেব বোঝাতে এই নম্বর ব্যবহার করা হয়।
দ্বিতীয়ত,
এফেকটিভ রিপ্রোডাকশন নম্বর (effective reproduction number) যেটা অত বড় মাপের নয়। এক্ষেত্রে যদি সামাজিক দূরত্বের বিধি মেনে চলা হয়, অথবা দেখা যায় সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ ভ্যাকসিন বা ড্রাগের প্রভাবে সেরে উঠেছেন, অথবা লোকজনের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে, তাহলে যতটা সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থেকে যায়, সেটা মাপা যায় এই এফেকটিভ রিপ্রোডাকশন নম্বরে।
চিনে ‘আর-নট’ নম্বর ৪.০ ছাড়িয়ে গেছে, দেশের অবস্থা জানাল আইসিএমআর
আইসিএমআরের তথ্য বলছে, বর্তমানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যেভাবে বিশ্বজোড়া মহামারীর আকার নিয়েছে, সেখানে রিপ্রোডাকশন নম্বরের স্কেল যদি ২.৫ থেকে শুরু করা যায়, তাহলে দেখা যাবে একজন সংক্রামিত সামাজিক দূরত্বের বিধি না মানলে ৩০ দিনে ৪০৬ জনকে আক্রান্ত করতে পারবেন। অন্যদিকে যদি লকডাউন বা পারস্পরিক দূরত্ব মানা যায়, তাহলে একজন আক্রান্তের থেকে কম করে আড়াই জনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থেকে যায়।
ইমপিরিয়াল কলেজ অব লন্ডন, চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স ইনস্টিটিউট অব অটোমেশন এবং ইউনিভার্সিটি অব অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের ডেটা বলছে, চিনে ‘আর-নট’ নম্বর বেড়ে হয়েছে ৪.০৮। অর্থাৎ স্কেলের বাইরে চলে গেছে নম্বর, মানে সংক্রমণ সেখানে বিধ্বংসী।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের রিপোর্ট বলছে, এই ‘আর-নট’ নম্বর চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায় হাম জাতীয় রোগের ক্ষেত্রে। বিশেষত ভারত ও চিনের মতো বেশি জনসংখ্যার দেশে এই রোগের আর-নট নম্বর অনেক বেশি। সার্স মহামারীর সময় আর-নট নম্বর ছিল ২.৭৫ এর কাছাকাছি। তবে এক-দু’মাসের মধ্যেই সেই নম্বর একের নীচে নেমে গেছিল। এর থেকেই বোঝা যায় যে সংক্রমণ কমতির দিকে। যদিও কোভিড-১৯ সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই নম্বরের স্কেল বেড়েই চলেছে। এখনও সংক্রমণ কমার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
তথ্যসূত্র:
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ
ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নাল
এনসিবিআই-পাবমেড