দ্য ওয়াল ব্যুরো: গ্রামে শিখদের জন্য সাতটি গুরুদ্বার রয়েছে। হিন্দুদের মন্দির দু'খানা। কিন্তু এতদিন একটাও মসজিদ ছিল না। তাই মুসলিম পড়শিদের কথা মাথায় রেখে হাতে হাত ধরে মসজিদ তৈরির কাজ শুরু করলেন শিখ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। পাঞ্জাবের মোগা জেলার ভুলার গ্রামের এই ঘটনায় সম্প্রীতির অনন্য নজির ফুটে উঠেছে।
রবিবার ছিল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠান। ধর্মমত নির্বিশেষে সাধারণ গ্রামবাসীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু বাধ সাধে বৃষ্টি। অঝোর বর্ষণে গোটা আয়োজন ভন্ডুল হওয়ার জোগাড়। বিরস মুখে সবাই যখন যে যার বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছেন, ঠিক তখনই একদল প্রস্তাব দেয়, সৎসঙ্গ সাহিবের গুরুদ্বার ফাঁকা পড়ে আছে। আর গুরুর ঘরে সকলের অবাধ যাতায়াত। বাকি অনুষ্ঠান তো সেখানেই সেরে ফেলা যেতে পারে!
কথাটা উঠতেই যেটুকু দেরি। তড়িঘড়ি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন সকলে। শিখ-হিন্দু-মুসলিম— ভেদাভেদের বালাই নেই। একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে খুলে ফেলেন লঙ্গর। বের করা হয় প্রকাণ্ড হাঁড়ি-কড়াই-গামলা-ডেকচি। খুন্তি নাড়িয়ে, আগুন ধরিয়ে শুরু হয় রান্নাবান্না। এমনকী শেষপাতে মিষ্টিমুখের কথা চিন্তা করে গরমাগরম জিলিপি ছাঁকার কাজও থেমে থাকেনি। বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। ভেসে আসছে আলতো ছাঁট। আর তার মধ্যে গুরুদ্বারের মেঝেতে বসে চলছে হাসিমুখে খোশগল্প। সেইসঙ্গে জিলিপিতে কামড়। কে হিন্দু, কে-ই বা মুসলিম— বর্ষণের তোড়ে সব প্রশ্ন ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে।
গ্রামের সরপঞ্চ পালা সিং জানান, এই প্রথম নয়। সাম্প্রদায়িক সদ্ভাব তাঁদের গ্রামে আগাগোড়া বজায় রয়েছে। পাশাপাশি মসজিদের বৃত্তান্ত জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, '৪৭ সালের আগে এখানে একটি মসজিদ ছিল। কিন্তু দেশভাগের পর যখন কাতারে কাতারে মুসলিম গ্রামবাসী পাকিস্তান পাড়ি দেন, তারপর থেকে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা ধসে পড়ে। গ্রামে রয়ে যায় চারঘর মুসলিম পরিবার। এতদিন তাদের প্রার্থনার খুব অসুবিধা হত। সেই কারণে আমরা সকলে মিলে ঠিক করি, ভেঙে পড়া মসজিদের জায়গাতেই নতুন মসজিদ তৈরি করা হবে।'
পালা সিং জোর গলায় জানান, তাঁরা কাউকে কোনওদিন 'সংখ্যালঘু' বলে দূরে ঠেলে দেননি। একে অপরের আপদে বিপদে গত ৭০ বছর ধরে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আর আজকের এই আয়োজন মুসলিম ভাইবোনেদের জন্য সামান্য 'সওগাত' মাত্র। তিনি যোগ করেন, শুধু একদিনের কায়িক পরিশ্রমই নয়। মসজিদ গড়তে যে আর্থিক সাহায্য প্রয়োজন, তার জন্যও সকলে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন৷ কেউ একশো। কেউ এক লাখ৷ যে যেমন পেরেছেন, তহবিলে তুলে দিয়েছেন। স্থানীয় ওয়াকফ বোর্ডও বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।