শহরের ঝলমলে আলোয় যখন দুর্গাপুজো শুরু হয়, তখন প্রান্তিক শিশুরা থাকে আনন্দ থেকে দূরে। সেই ব্যবধান ঘোচাতে মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এবার নিজেদের হাতে দুর্গা প্রতিমা গড়ে পৌঁছে দেবে পুরুলিয়ার শবর গ্রামে।

রং ছড়াচ্ছে ‘পুজো পরিক্রমা’
শেষ আপডেট: 11 September 2025 18:51
দুগ্গাপুজোয় পুরুলিয়া যাব পরিক্রমার বাসে
শবর গাঁয়ে পুজোর আনন্দ সেপ্টেম্বর মাসে...
কোনও শিশুর আশ্রয় একটি ভাঙা ঘর, কারও আবার দিনের পর দিন কাটছে অনাথ আশ্রমের চার দেওয়ালে। কারও পুজোয় নেই নতুন পোশাকের খুশি, কারও চোখে জমেছে অপূর্ণ স্বপ্ন। সেই সব অবহেলিত ছোট্ট প্রাণগুলোর মুখে একটু হাসি ফোটাতেই তো বছরের পর বছর উদ্যোগ নিচ্ছে মহারাজা কলকাতার মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা।
পড়ুয়াদের হাতে দেবী প্রতিমা
উৎসব মানেই তো সবার জন্য আনন্দ, কিন্তু সেই আনন্দের রং কি সবার জীবনে পৌঁছায়? শহরের ঝলমলে আলোয় যখন দুর্গাপুজো শুরু হয়, তখন গ্রামের প্রান্তিক মানুষরা অনেক সময়ই থেকে যায় সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত। বছরের পর বছর সেই ব্যবধান ঘোচাতে এক অসাধারণ উদ্যোগ নেয় মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। তারা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং প্রান্তিক শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে হাতে তুলে নিয়েছে মাটি, খড় আর রং-তুলি। পড়াশোনার পর অথবা কলেজ শেষে আড্ডা না দিয়ে, পড়ুয়ারা এখন এই প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত। এই 'পুজো পরিক্রমা' নিছকই একটি উৎসব নয়, বরং এটি মানবতার এক নতুন অধ্যায়।

কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের প্রধান বিশ্বজিৎ দাস দ্য ওয়ালকে বলেন, "আমাদের বিভাগের পড়ুয়াদের নিয়ে তৃতীয়ার দিন পুরুলিয়ার ওন্দায় পৌঁছচ্ছি। যাতে, সেই প্রান্তিক জায়গায় থাকা শিশুরাও পুজোর আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে।আবার আমরা প্রায় ২৫০জন শিশুদের এই আনন্দ দিতে শবর গ্রামে যাচ্ছি।''
প্রতিমা বানিয়ে, তা নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ ১৫ বছরে এই প্রথমবার নেওয়া হয়েছে। গোটা পরিকল্পনাটা নিয়ে মণীন্দ্র চন্দ্র কলেজের সাংবাদিকতা বিভাগের অফিস কর্মী বুবাই চক্রবর্তী দ্য ওয়ালকে জানালেন, 'এবারের এই উদ্যোগের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হল, কলকাতার পুজোর চাকচিক্য তারা দেখেনি। তাই আমরা প্রতিমা নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে প্রতীকী পুজো করা হবে। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে নতুন পোশাক আর খাবার। তারপরে বৃক্ষরোপণ করে সেখানে প্রতিমাকে রাখা হবে। এর মাধ্যমে আমরা বৃক্ষরোপণ কতটা জরুরি, সেই বার্তাও আমরা দিয়ে আসতে চাই।'

'পুজো পরিক্রমা'র ১৫ বছর- এবার পুজোর আলো শবর গ্রামে
কলকাতার মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র কলেজের 'পুজো পরিক্রমা' এবার ১৫ বছরে পা দিয়েছে, আর এই বিশেষ বছরে তারা বেছে নিয়েছে পুরুলিয়ার শবর গ্রামকে। এবারের পরিক্রমায় শুধু নতুন পোশাক আর খাবার নয়, থাকছে পড়ুয়াদের হাতে গড়া একটি দুর্গা প্রতিমা, যা নিয়ে তারা পৌঁছে যাবে পুরুলিয়ার ওন্দা গ্রামে।
কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই এই প্রতিমা তৈরি করছে। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বিবেক সর্দার এই প্রতিমা তৈরির মূল কারিগর। বিবেক জানান, ছোট থেকেই মূর্তি তৈরির শখ থাকলেও দুর্গা প্রতিমা এই প্রথম তৈরি করছেন। সহপাঠীদের সাহায্য নিয়ে খড়, কাগজ ও মাটি দিয়ে যত্ন করে তৈরি হচ্ছে প্রায় দেড় ফুটের এই প্রতিমা, যা পুরুলিয়ায় পৌঁছে দেবে পুজোর আনন্দ।
একসঙ্গে সব বিভাগ, সবার জন্য আনন্দ
এই 'পুজো পরিক্রমা' শুধু সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের উদ্যোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রসায়ন, ইংরেজি, সংখ্যাতত্ত্ব, কম্পিউটার সায়েন্স, ইতিহাসসহ কলেজের অন্যান্য বিভাগও। সবাই মিলে আর্থিক সহায়তা দিয়ে এই মহৎ উদ্যোগে সামিল হয়েছে।
বিশ্বজিৎ দাস আরও জানান, তৃতীয়ার দিন তারা পুরুলিয়ার ওন্দায় শবর কল্যাণ সমিতির সাহায্যে প্রতিমা স্থাপন ও পুজোর উদ্বোধন করবেন। পড়ুয়ারা সেখানকার শিশুদের নতুন পোশাক দেবে, যাতে তারাও এই উৎসবে সামিল হতে পারে। এই উদ্যোগের মূল ভাবনা হল, যখন চারদিকে সবাই উৎসবে মাতবে, তখন এই প্রান্তিক শিশুরাও যেন আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়।