দ্য ওয়াল ব্যুরো : ১৯৯৬ সালে যা হয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তি হবে ২০১৯-এ। গত মঙ্গলবারও এমন কথা বলেছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশের নেতা চন্দ্রবাবু নায়ডু। তিনি ভেবেছিলেন, কোনও দলই কেন্দ্রে গরিষ্ঠতা পাবে না। সেই সুযোগে আঞ্চলিক দলগুলি জোট বেঁধে দিল্লিতে সরকার গড়তে পারবে। বৃহস্পতিবার ভোট গণনা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে বোঝা যায়, দারুণ ভুল করেছিলেন তিনি। শুরু থেকেই মানুষ তৃতীয় ফ্রন্টের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
কেন এমন হল?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চন্দ্রবাবু যাদের নিয়ে কেন্দ্রে মিলিজুলি সরকার গড়তে গিয়েছিলেন, তাদের নিজেদেরই পায়ের নীচে মাটি শক্ত ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য কয়েকটি দল একজোট হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কোনও অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি তৈরি করা যায়নি। দেশবাসীর সামনে তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্য বিকল্প বলে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, তথাকথিত তৃতীয় ফ্রন্টে কে নেতৃত্ব দেবেন, তাও স্পষ্ট হয়নি। যে নেতারা তৃতীয় ফ্রন্টের কথা বলতেন, তাঁদের অনেকেরই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা ছিল। এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে গন্ডগোল লেগে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল।
প্রধানমন্ত্রী মোদীও বার বার ভোটারদের এই সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বিরোধীদের জোটকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘মহামিলাওট’। প্রতিটি জনসভায় বলেছেন, বিজেপি বাদে কেউ স্থিতিশীল সরকার গড়তে পারবে না। বিরোধীরা যদি ক্ষমতায় আসে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করবে। তার জেরে সরকার পড়ে যাবে।
ভোটের ফলে পরিষ্কার, মানুষ স্থিতিশীলতার পক্ষে রায় দিয়েছেন।
তৃতীয় ফ্রন্টের ধারণা যে ধাক্কা খাচ্ছে, তার ইঙ্গিত মিলেছিল তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্রিগেড সমাবেশেই। গত ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় ‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়া’ সমাবেশ হয়। সেখানে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী নিজে আসেননি। পাঠিয়েছিলেন মল্লিকার্জুন খাড়গে ও অভিষেক মনু সিংভিকে। বিএসপির সুপ্রিমো মায়াবতীও আসেননি। পাঠিয়েছিলেন তাঁর প্রতিনিধি সতীশ মিশ্রকে। সমাবেশে এনসিপির শরদ পওয়ার, আপের অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তেলুগু দেশমের চন্দ্রবাবু নায়ডু, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ সিং যাদব, আরজেডির তেজস্বী যাদব, ন্যাশনাল কনফারেন্সের ফারুক আবদুল্লা ও তাঁর ছেলে ওমর আবদুল্লা প্রমুখ ছিলেন। বিজেপির বিক্ষুব্ধ নেতাদের মধ্যে ছিলেন যশবন্ত সিনহা, শত্রুঘ্ন সিনহা ও অরুণ শৌরি।
এই নেতাদের কেউ এবার ভোটে ভালো ফল করেননি। অনেকেই ভেবেছিলেন, অন্তত উত্তরপ্রদেশে ভালো ফল করবে ‘বুয়া-বাবুয়া’ জোট। বাস্তবে সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির মহাগঠবন্ধন শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ।
মমতার সমাবেশে আসেনি চন্দ্রশেখর রাওয়ের তেলঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি ও নবীন পট্টনায়েকের বিজেডি। এনডিএ বহির্ভূত আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে এই দু’টি পার্টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আপত্তি ছিল কংগ্রেসকে নিয়ে। রাহুল গান্ধীর দলের সঙ্গে এক মঞ্চে যেতে চায়নি তারা। চন্দ্রশেখর রাও চেয়েছিলেন বিজেপি ও কংগ্রেস, উভয়কেই বাদ দিয়ে ফেডারেল ফ্রন্ট গড়তে। অর্থাৎ তথাকথিত তৃতীয় ফ্রন্ট কাদের নিয়ে গঠিত হবে, তা নিয়েই নেতাদের মধ্যে মতের মিল ছিল না।
মল্লিকার্জুন খাড়গে জানুয়ারির ইউনাইটেড ইন্ডিয়া সমাবেশে এসেছিলেন বটে কিন্তু তিনিই পরে তৃতীয় ফ্রন্টের ধারণাকে উড়িয়ে দেন। গত সোমবারই তিনি বলেন, কীসের তৃতীয় ফ্রন্ট? কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোটই ক্ষমতায় আসবে। রাহুল গান্ধীই সব ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
অর্থাৎ তথাকথিত তৃতীয় ফ্রন্টের মঞ্চে যে নেতারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদেরই কেউ কেউ ওই ফ্রন্টের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না। শুধু মোদী ঝড় থেকে পিঠ বাঁচানোর জন্য একটা আড়াল খুঁজছিলেন মাত্র। তারই নাম দিয়েছিলেন তৃতীয় ফ্রন্ট। মানুষ তার ওপরে আস্থা রাখেনি।