
মৈপীঠে লাঠি হাতে বাঘের সঙ্গে বনকর্মীদের সংঘর্ষ।
শেষ আপডেট: 11 February 2025 18:42
সুমন বটব্যাল
যেন দক্ষিণী ছবির লাইভ টেলিকাস্ট! বাঘের মোকাবিলায় শুধুই একটা লাঠি! জাল, ঘুমপাড়ানি বন্দুক, বাজি পটকার মতো কোনও সরঞ্জাম নেই! লাঠিতে করেই ক্রমাগত বাঘকে আঘাত করে চলেছেন বনকর্মীরা!
সোমবার দুপুর থেকেই ভাইরাল ওপরের ছবিটা! তারপর থেকেই প্রশ্নের মুখে বনকর্মীদের পেশাদারিত্ব। কারণ, মৈপীঠে এই প্রথম বাঘ বেরোল, তা কিন্তু নয়। বাঙালির বারো মাসে তেরো পাবর্ণের মতো এখানে প্রতিমাসেই একাধিকবার বাঘের দেখা মেলে।
অন্তত বন দফতরের পরিসংখ্যান তেমনই জানাচ্ছে। ফলে বাঘের মোকাবিলায় আপৎকালীন কী কী পদক্ষেপ করতে হয়, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকার কথা বনকর্মীদের। তা সত্ত্বেও কীভাবে ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মতো বনকর্মীরা বাঘ ধরতে গিয়েছিলেন তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
সোমবার মৈপীঠে বন দফতরের কুইক রেসপন্স টিমের সদস্য গণেশ শ্যামলের মাথাটাতেই কামড় বসাতে যাচ্ছিল বাঘ মামা! বনকর্মীদের একটানা লাঠির আঘাতে শেষমেশ রণে ভঙ্গে দিয়ে জঙ্গলে ফেরে রয়্যাল বেঙ্গল। আপাতত এসএসকেএমের আইসিইউতে যমে মানুষে টানাটানি অবস্থা গণেশের।
ভাইরাল ভিডিও দেখে বন দফতরের বহু কর্তা ব্যক্তি তো বটেই শিউরে উঠছেন সুন্দরবনে বাঘের সঙ্গে 'বাস' করা গ্রামবাসীরাও। একান্ত আলাপচারিতায় তাঁরা বলছেন, লাঠির ক্রমাগত আঘাতে একসময় রণেভঙ্গ দিয়ে বাঘটা জঙ্গলে ফিরেছিল ঠিকই কিন্তু যদি তা না হত? যদি লাঠিধারীর দিকেই বাঘ তেড়ে যেত? তাহলে কী হত, সেটা ভেবেই কুলকুল করে ঘেমে উঠছেন তাঁরা।
সূত্রের খবর, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ এবং বন কর্মীদের কাছ থেকে কৈফিয়তও চেয়েছে রাজ্য। তবে এবিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি রাজ্যের বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা। বারংবার ফোন করলেও প্রতিক্রিয়া মেলেনি স্থানীয় ডিএফও নিশা গোস্বামীর।
তবে একান্ত আলাপ চারিতায় বনকর্তারা মানছেন, বাঘের সামনে যেভাবে নিরস্ত্র অবস্থায় বনকর্মীরা হাজির হয়েছিলেন, তা মারাত্মক ভুল বললেও কম বলা হয়। এবং বিপদের মুখে পড়ে দিকবিদিক শূন্য হয়ে বনকর্মীরা যেভাবে লাঠিতে করে বাঘকে ক্রমাগত আঘাত করছিলেন, তাতে বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষার জন্য থাকা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠতে পারে।
সেই সঙ্গে আরও একটি জিনিস ভাবাচ্ছে বন কর্তাদের। ইদানীং দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহলেও বাঘের আনাগোনা বেড়েছে। অতীতে লালগড়ের জঙ্গল এবং তারও আগে পুরুলিয়ায় আস্ত বাঘকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিলেন গ্রামবাসীরা। সোমবার যেভাবে লাঠি হাতে খোদ বন দফতরের কর্মীরা বাঘের সঙ্গে মৈপীঠে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন, তাতে জঙ্গলমহলের বাসিন্দারাও যদি অদূর ভবিষ্যতে বাঘের মোকাবিলায় হাতে লাঠি তুলে দেন, তাহলে কীহবে? নতুন করে এটাও এটাও চিন্তায় ফেলেছে বন কর্তাদের।
বন দফতরের এক কর্তা বলেন, অভিযানে যাওয়ার সময় বনকর্মীরা কেন জাল, ঘুম পাড়ানি বন্দুক কিংবা বাজি পটকা সঙ্গে করে নিয়ে যাননি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বস্তুত, আচমকা আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই জাল রাখা হয়, যাতে হিংস্র বন্যপ্রাণীর দিকে জাল ছুড়ে তাকে সহজে কব্জা করা যায়। দ্বিতীয়ত, বাঘ বা এই জাতীয় বন্যজন্তুকে জঙ্গলে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাজি পটকাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাতেও কাজ না হলে তখন ঘুমপাড়ানি গুলি ছুড়ে সংশ্লিষ্ট প্রাণীটিকে ক্ষান্ত করা হয়। তা না করে স্রেফ লাঠি হাতে বাঘ ধরতে যাওয়ার ঘটনা আত্মহত্যার শামিল বলেই মনে করছেন তাঁরা।