
শেষ আপডেট: 6 January 2021 09:44
প্রণববাবুকে বলা হত ‘ম্যান অব কোয়ালিশন’। কেন্দ্রে প্রথম ইউপিএ সরকার ও দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের মধ্য মেয়াদ পর্যন্ত জোটকে অটুট রাখার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, দুই মেয়াদে জোটের ধরন ও গঠনের মধ্যে বড় ফারাক ছিল। তাঁর কথায়, “বাম দলগুলি ও সমাজবাদী পার্টি ছাড়া প্রথম ইউপিএ জোটেরই কোনও অস্তিত্ব থাকত না। বামেরা যখন সমর্থন প্রত্যাহার করে নিল তখন আস্থা ভোটে সমাজবাদী পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার টিকে গেছিল।”
প্রণববাবু লিখেছেন, “দ্বিতীয় ইউপিএ যখন গঠিত হয় তখন প্রথম মেয়াদের অনেক শরিক যেমন বাম দলগুলি, আরজেডি তাতে ছিল না। পরিবর্তে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ১৯ জন সাংসদকে নিয়ে জোটে সামিল হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তিনিও দির্ঘদিন সমর্থন টিকিয়ে রাখেননি। অথচ ২০০৯ সালের লোকসভা ভোট ও ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে ছিলেন তিনি। ইউপিএ- টুর অন্যতম সদস্য হয়েও ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি (মমতা) জোট ছেড়ে দেন।”
প্রণববাবুর এই কথা থেকে অনেকে মনে করছেন, প্রণবের সমালোচনার নিশানায় রয়েছেন মনমোহন সিংহই।
এমনিতে সেই সময়ে অনেক পর্যবেক্ষক বলতেন, প্রণবকে সমস্ত ঝক্কি সামলাতে হয়, আর শুধু ক্ষমতা ভোগ করছেন মনমোহন। পরমাণু চুক্তির সময়ে তাঁর অনমনীয়তা বা এফডিআইয়ের মতো বিষয় নিয়ে তাঁর অনড় অবস্থানের কারণেই জোট ভঙ্গুর হয়েছে। তখন এও শোনা যেত, দশ জনপথ থেকে তাঁর উপর চাপ দিলে মনমোহন প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার কথা বলতেন। ফলে একটা সীমার উপর যেতে পারতেন না কেউই।
প্রণববাবু হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, প্রথম জমানায় মনমোহনের কারণে যেমন বামেরা জোট ছেড়েছিলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর কারণেই জোট দুর্বল হয়।
আত্মজীবনীতে প্রণব লিখেছেন, "চোদ্দ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের বিপর্যয়ের পর অনেকে বলতেন ২০০৪ সালে আমাকে প্রধানমন্ত্রী করা হলে এই ভারডুবি হত না।" তাঁর কথায়, “আমি অবশ্য এ কথা মনে করি না। তবে বিশ্বাস করি যে আমি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দল রাজনৈতিক সূচিমুখ হারিয়ে ফেলে। সনিয়া যেমন দলের বিষয় সামলাতে পারছিলেন না, তেমনই সংসদে দীর্ঘ সময় মনমোহন সিংহের অনুপস্থিতি সাংসদদের সঙ্গে একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। অথচ আমি যখন ছিলাম তখন মুলায়ম সিং, মায়াবতী সহ বহু নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ রাখতাম।”
আঞ্চলিক নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন ছিল তাও আত্মজীবনীতে লিখেছেন প্রণববাবু। তাঁর কথায়, "মায়াবতীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্যর কারণেই রাষ্ট্রপতি ভোটে তাঁর সমর্থন পেয়েছিলাম। একই ভাবে সমাজবাদী পার্টির সমর্থনও পেয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তী কালে কিছু কংগ্রেস নেতার অবিবেচকের মতো কাজ ও দম্ভই দলের ক্ষতি করে। মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস সংগঠন নিয়ে খুব বাজে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার জন্য সনিয়া গান্ধী আংশিক ভাবে দায়ী। বিলাসরাও দেশমুখের মৃত্যুর পর শিবরাজ পাটিল বা সুশীল শিন্ডেকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত ছিল। আমি থাকলে তাই করতাম। আমি থাকলে তেলেঙ্গনা পৃথক রাজ্যও তৈরি করতে দিতাম না।"
প্রণববাবুর এ কথাগুলো যে সঠিক স্থানে আঘাত করেছে তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কারণ, পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্য তৈরি করে অন্ধ্রপ্রদেশে কংগ্রেসকে ডুবিয়ে ছাড়েন মনমোহন-সনিয়া। আর মহারাষ্ট্র নিয়ে অব্যবস্থা তো ছিল চরম। বিলাসরাও দেশমুখ, অশোক চহ্বাণকে পরপর মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরানো, সেই স্থানে নিপাট ভাল মানুষ অথচ রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল পৃথ্বীরাজ চহ্বাণকে বসানো— এ সব ছিল ঐতিহাসিক ভুল। প্রণববাবু হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, সনিয়া আমার কথা আর একটু শুনতে পারতেন। তাঁর উপর বিশ্বাস রাখলে পার্টিটার এতো ভয়ঙ্কর বিপর্যয় হত না।