দ্য ওয়াল ব্যুরো: যত বেলা গড়াচ্ছে, মৃতের সংখ্যা বাড়ছে বিশাখাপত্তনমে। পুলিশ জানিয়েছে, আরও তিন জনের মৃত্যু হয়েছে গ্যাস লিক কাণ্ডে। মৃতের সংখ্যা বেড়ে হল ১১। এর মধ্যে রয়েছে দুই শিশুও হাসপাতালে যে ৮০০ জন ভর্তি রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কয়েক জনকে ছেড়ে দিলেও, এখনও অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। যত দ্রুত সম্ভব গ্যাসের প্রভাব মুক্ত করার চেষ্টা চলছে তাঁদের। অনেকের এখনও জ্ঞান ফেরেনি বলে জানা গেছে। তবে আরও প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ এলাকার আরও নানা প্রান্তে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে।
সবমিলিয়ে একথা স্পষ্ট, যে মারাত্মক বিষক্রিয়া ঘটিয়েছে ওই গ্যাস। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ক্ষতিকর স্টাইরিন গ্যাসের প্রভাবেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এত মানুষ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্টাইরিন গ্যাস সাধারণ তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। ফলে অন্য কোনও গ্যাস লিক হয়েছে, যাতে মিশে ছিল স্টাইরিনের বাষ্প-- এই সম্ভাবনাই জোরদার হচ্ছে ক্রমে।

তবে প্রশ্ন একটাই, কোন গাফিলতিতে ঘটে গেল এত বড় বিপর্যয়! ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লির জাতীয় পরিবেশ আদালতে ওই কারখানার মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সরকার যাতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গড়ে গোটা ঘটনাটির তদন্ত ও বিচার করে, সে বিষয়েও আবেদন করেছে তারা।
কেন্দ্রীয় সরকার ছাড় দেওয়ায় সবেমাত্র খুলেছিল অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের 'এলজি পলিমার ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড' নামের রাসায়নিক কারখানাটি। এর পরেই বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৩টে নাগাদ সেখান থেকে গ্যাস লিক শুরু হয়।
জানা গেছে, সে সময়ে কারখানায় ছিলেন শুধু নিরাপত্তারক্ষীরা। আচমকা গ্যাস লিক হওয়ায় অচৈতন্য হয়ে পড়েন তাঁরা। ফলে কেউ কিছু জানতেই পারেননি, গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে থাকে লোকালয়ে। সাড়ে ৪টের দিকে আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের চোখ জ্বালা করতে থাকে ও শ্বাসকষ্ট শুরু হতে থাকে। অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে যায় অনেকের। তখন খবর যায় পুলিশে। জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারের কাজে নামে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।
সকালে গ্যাস লিকের খবর ফ্যাক্টরিতে পৌঁছনো মাত্র গোটা ফ্যাক্টরির সমস্ত কাজ বন্ধ করে লকডাউন করে দেওয়া হয় কারখানা। পুলিশ-প্রশাসনকে জানানো হয়, ক্ষতিকর গ্যাসটি সঙ্গে সঙ্গে লিকুইডে পরিণত করা হয়, যা বাইরে ছড়িয়ে ক্ষতি বাড়াতে পারবে না। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। যেটুকু গ্যাস লিক হয়েছে, তাতেই আশপাশের অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।
বিশাখাপত্তনমের দক্ষিণ শহরতলির বেঙ্কটপুরের গোপালপত্তনম। বৃহস্পতিবার ভোররাত থেকে বিষাক্ত গ্যাস ধোঁয়াশার মতো ঘিরে ফেলেছে গোটা এলাকাকে। রাস্তাঘাটে জ্ঞান হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছেন মানুষজন। গরু, কুকুরের অসাড় দেহও পড়ে রয়েছে তারই পাশে। ভোরের আলো ফোটার পরে গোটা এলাকায় দৌড়োদৌড়ি, চেঁচামেচি, আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। গ্যাসের গন্ধ তখন আরও জোরালো। মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে।
১১টা প্রাণ চলে গেছে এ পর্যন্ত, আরও বহু যাওয়ার সম্ভাবনা। যেন সাড়ে তিন দশক আগে ভূপালে ঘটে যাওয়া সেই গ্যাস দুর্ঘটনাই আরও একবার ঘটে গেল। প্রশ্ন উঠেছে, নিছক অসাবধানতা নাকি কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, নাকি শুধুই দুর্ঘটনা! কীভাবে এত বড় বিপদ হল? পুলিশ অবশ্য প্রাথমিক তদন্তের পরে ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, লকডাউনের জেরে মার্চ থেকেই বন্ধ ছিল কারখানাটি। সেই সময় থেকেই একেবারেই দেখাশোনা করা হয়নি গ্যাসের ট্যাঙ্কগুলো। তার ফলেই এই কাণ্ড ঘটেছে। যদিও কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, কারখানা বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ চলছিল।
বিষাক্ত গ্যাস পরিবেশে সঙ্গে অনেকটাই মিশে গিয়েছে। আট-দশ ঘণ্টা পর তার প্রভাব শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশাখাপত্তনম পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল। তার মধ্যে সেই বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাব থেকে বাসিন্দাদের বাঁচাতে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। তার ওপরে এ গ্যাস ছড়িয়েছে ভোর রাতে, সকলের ঘুমের মধ্যে।
কারখানার মালিক সংস্থা দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাটারি নির্মাতা এলজি কেমিক্যাল লিমিটেডের তরফে বলা হয়েছে, “কীভাবে ওই গ্যাস লিক হল এবং এর জেরে কত জনের মৃত্যু হয়েছে, কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছি।” এর বেশি আর কিছুই জানায়নি মালিকপক্ষ।

বিশাখাপত্তনমের পুর কর্পোরেশনের কমিশনার শ্রীজানা গুমল্লা জানিয়েছেন, দেশজুড়ে চলতে থাকা লকডাউনে বিধিনিষেধ খানিকটা শিথিল করার পরেই কয়েকদিন আগে এই প্ল্যান্টটি পুনরায় চালু করা হয়। এতদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ট্যাঙ্কের ভিতর রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছিল। এর ফলেই ওই বিষাক্ত গ্যাস লিক করে বলে দাবি তাঁর।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর বিশাখাপত্তনামের সহকারী পুলিশ কমিশনার স্বরূপ রানি জানান তদন্তও তেমনটাই বলছে। একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস মজুত থাকায় বিক্রিয়া ঘটে এবং কোনও ভাবে বাইরে বেরিয়ে যায় গ্যাস। যদিও প্লান্টের মালিক এলজি চেম জানিয়েছেন, লকডাউনের কারণে ওই প্ল্যান্টটি বন্ধ থাকলেও ভিতরে রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে কিছু কর্মী ছিলেন আগাগোড়াই।