
শেষ আপডেট: 12 April 2024 16:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো, নদিয়া: একটা সময় চৈত্র শেষে গাজনের মতো বহুরূপীরাও জড়িয়ে ছিলেন বাংলার ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সঙ্গে। গোটা চৈত্র মাস ধরে শিবের আরাধনা করেন বাংলার একটা বড় অংশের মানুষ। সোমবারগুলিতে উপোস করে শিবের মাথায় জল ঢালেন ভক্তরা। এই ভরা চৈত্রেই আগে বেরিয়ে পড়তেন বহুরূপীরা। শিব-পার্বতী-কালী সেজে ঘুরে বেড়াতেন পাড়ায় পাড়ায়। মানুষের মনোরঞ্জনের এই উপায় কিছু বছর আগেও ছিল তুমুল জনপ্রিয়। তবে এখন নানা বিনোদনের চাপে কোণঠাসা।
তবে এই মরা বাজারেও বাঙালি সংস্কৃতির এই ধারাকে বজায় রাখার চেষ্টা করে চলেছেন শান্তিপুর আর ফুলিয়ার তাঁতশিল্পীরা। সকলেই পেশাদার তাঁত শ্রমিক। সারা বছর তাঁতের কাজ করতে করতে যখন একঘেয়েমি চলে আসে তখন কিছুটা আনন্দ নিতেই সাজেন বহুরূপীর সাজ। বছর শেষের এই কটা দিন সকাল হলেই মুখে রং মেখে, নানা পরিধানে কেউ সাজেন শিব, কেউ সাজেন পার্বতী। তারপর গ্রামের পথে পথে ঘুরে একদিকে যেমন নিজেরা আনন্দ পান অন্যদিকে আনন্দ দেন অন্যদেরও। বাড়তি আয়ও হয় কিছু। তাঁত শিল্পের অবস্থাও যে ভাল না।
ফুলিয়ার তাঁতশিল্পী সুরেন সরকার, বিশ্বজিৎ বসাকরা জানান, কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁরা তাঁতের কাজ করেন। কিন্তু এখন আর আগের বাজার নেই। তাঁরা বলেন, "এখন সারাবছর যে তাঁতশিল্পীদের ধারাবাহিক আয় হয়, তা নয়। আগে নিজেদের মনোরঞ্জনের জন্য চৈত্র শেষে বহুরূপী সাজতাম আমরা। এখন তাতে মিশে থাকে বাড়তি রোজগারের একটা তাগিদ। তবে খুব যে কিছু আয় হয় তেমনটাও নয়। খানিকটা মনের খোরাক মেটানো আর খানিকটা বাড়তি রোজগার এই দুইয়ের চাহিদা মেটাতেই সং সাজা।"
যাঁরা তাঁদের সাজিয়ে তোলেন সেই মেক-আপ শিল্পীদের গলাতেও ঝরে পড়ল হতাশার সুর। রোজগার নেই যে তেমন। আগে বছরভর বহুরূপীদের সাজিয়ে দিয়ে আয় হত অনেকখানি। এখন পেট চালাতে অন্য ব্যবস্থা করতে হয়। ফুলিয়ায় দেখা মিলল এক প্রবীণ মেক-আপ শিল্পীর। তিনি জানালেন, এখানে এখন দিন কয়েকের কাজ। বাকি সময়টা পেট চালানোর জন্য অন্য কাজ খুঁজে বেড়াতে হয়।
একটা সময়ে প্রচুর মানুষ এই বহুরূপী পেশায় এসে রোজগার করতেন। ট্রেনের কামরায়, গ্রামের পথে তাঁদের দেখলেই উপচে পড়ত ভিড়। সকাল হতে হতেই নানা দেবদেবীর সাজে সজ্জিত হয়ে পথে নামতেন তাঁরা। চাল-ডাল-পয়সা রোজগার করে রাতে ঘরে ফিরতেন বহুরূপীরা। এভাবেই তাঁরা পালন করতেন পরিবার। কালের বিবর্তনে সেই পেশা হারাতে বসলেও চৈত্র শেষে আজও বাংলার এখানে সেখানে দেখা মেলে বহুরূপীদের। তাঁরা মনে করিয়ে দেন একটা সময় বাংলা সংস্কৃতির আঙিনার একটা বড় অংশ জুড়েছিল এই শিল্প।