
শেষ আপডেট: 24 July 2018 13:59
জীবন আহমেদ[/caption]
আর এর পরের দিনই, মঙ্গলবার, সেই ছবি তোলার ‘অপরাধে’ নিজের পেশার লোকদের হাতেই জীবন আহমেদ মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। জানা গিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যেখানে ছবিটি তোলা হয়েছে, সেখানেই তাঁকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হল, অভিযুক্তেরা সকলেই পেশাদার ফোটোগ্রাফার।
বিভিন্ন ক্যাপশন দিয়ে নিজের দেওয়ালে এই ছবির প্রশংসা করেন বেশির ভাগ মানুষ। উন্মুক্ত ভালবাসা চর্চার সমর্থনে গলা তোলেন নেটিজেনদের একটা বড় অংশ। এর পাশাপাশি এমন প্রশ্নও ওঠে, এমন ছবি তোলার আগে বা প্রকাশ করার আগে ছবিতে উপস্থিত ছেলেমেয়ে দু’টির অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না। অনেকে এ-ও বলেন, সারা দেশে ঘটে চলা অসংখ্য দুর্নীতি ও অনাচারের ঘটনায় কখনও এমন সম্মিলিত কণ্ঠ শোনা যায় না সোশ্যাল মিডিয়ায়, কিন্তু এই ছবি ঘিরে গড়ে ওঠা উন্মাদনা যেন সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
কিন্তু এক শ্রেণির ফোটোগ্রাফারের অভিযোগ, এ ছবি অশ্লীল। জীবন আহমেদ তাঁদের সুন্দর পেশাকে কলঙ্কিত করেছেন। ঘটনায় স্তম্ভিত জীবন। তিনি বলেন, “আমার পেশার লোকেরাই আমাকে মেরেছে। প্রকাশ্যে, সর্বসমক্ষে। এ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি।” তিনি এ-ও জানান, তাঁকে মারার সময়ে অভিযুক্তেরা দাবি করে, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন মারার। সেই সঙ্গেই তারা বারবার বলে, জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং পেশা—দুই-ই কলঙ্কিত করেছেন।
পরে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে ফোন করে তাঁকে জানানো হয়, মারধরের কোনও নির্দেশ দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয়।
উল্লেখ্য, সোমবার জীবন আহমেদের তোলা এই ছবিটি প্রথমে তাঁর নিজস্ব কর্মরত অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত হয়। এর পরে তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি আপলোড করেন ছবিটি। নাম দেন, বর্ষা মঙ্গল। তার পর থেকেই তা ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবারের মারধরের ঘটনার পরে জীবন আহমেদ তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, “আজ থেকে সাংবাদিকতা থেকে বিদায় নিলাম।”
বস্তুত, বাংলাদেশে এর আগেও একাধিক বার সামনে এসেছে ব্লগার হত্যার মতো ঘটনা। স্রোতের বিরুদ্ধে এগোলেই যে বাধা আসবে, তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বারবারই। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার একটি ঘটনা খুব সহজ এবং স্বাভাবিক নয়। সেই জায়গা থেকে এই ছবি ভাইরাল হওয়ার ঘটনা এক দিকে যেমন আশা জাগায়, অন্য দিকে তেমন আশঙ্কাও বাড়ায়। সেই আশঙ্কারই খানিকটা যেন সত্যি হল এ দিন জীবন আহমেদের মার খাওয়ার ঘটনায়।
বাংলাদেশের লেখিকা ও শিক্ষিকা তামান্না সেতু এ বিষয়ে জানান, ছবির যে ঘটনাটি, তা খুবই সাধারণ এবং স্বাভাবিক। এতে আদৌ কোন অশ্লীলতা আছে বলে তিনি মনে করেন না। কিন্তু যদি ওই ছবির ছেলেমেয়ে দু'টির অনুমতি ছাড়া ছবিটি প্রকাশ করা হয়, তা হলে তা অন্যায় হয়েছে বলে মনে করি। কারণ তাঁরা যা করেছেন, তা কেবল ঐ সময়ে ঐ পরিবেশে করেছেন। সকলকে দেখাতে করেননি। এই ছবির কারণে ওঁদের সামাজিক ভাবে বিব্রত হতে হতে পারে। এমনকী ওঁদের পরিবারও বিব্রতকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে। ফোটোগ্রাফার নিজেও মঙ্গল-স্মারকই খুঁজে পেয়েছেন ছবিতে। তাই ক্যাপশন দিয়েছেন 'বর্ষা মঙ্গল'। তা হলে কেন তাঁদের বিব্রত করা? আবার, ছবিটি যিনি তুললেন এবং প্রকাশ করলেন তাঁর উপরে হামলা করল তাঁরই পেশার আরও কয়েক জন। এটা নিশ্চিত ভাবেই ঘৃণ্য ব্যাপার। হামলাকারীদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তাঁরা সংখ্যায় কম, সংকীর্ণ চিন্তার সংবাদকর্মী।
শুধু বাংলাদেশ কেন, কয়েক দিন আগেই কলকাতা শহরেও মেট্রো রেলের একটি ঘটনা ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়ায় সর্ব স্তরে। অভিযোগ ওঠে, এক তরুণ-তরুণী মেট্রোয় ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকায় আপত্তি জানান নাগরিকেরা। তাতে কর্ণপাত না করলে স্টেশনে নামিয়ে তাঁদের মারধরেরও অভিযোগ ওঠে। ব্যক্তি স্বাধীনতার উপরে নীতিপুলিশি চাপিয়ে দেওয়ার এই তীব্র চেষ্টা সাম্প্রতিক কালে তেমন একটা দেখেনি এই শহর।
তারই ছাপ যেন ওপার বাংলায়, চুমুর ছবিতে ‘অশ্লীলতা’র ট্যাগ চাপিয়ে আক্রমণ করা হল ছবির শিল্পীকে।