দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৯২ সাল। ইউনিভার্সিটি অব টেনেসিতে ইলেকট্রোস্ট্যাটিক ফিলট্রেশন প্রযুক্তির গবেষণায় ব্যস্ত এক যুবক। অঙ্ক, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন সবেতেই তুখোড় মেধা তাঁর। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একাধিক বিভাগে ডিগ্রি। শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য সুরক্ষার একটা আবরণী বানানোর দরকার ছিল সেই সময়। এয়ার ফিলট্রেশন থিয়োরির ব্যবহারে ওই তরুণ বিজ্ঞানী বানিয়েছিলেন এমন এক মাস্ক যা শিল্প বা রাসায়নিক কারখানার ক্ষতিকর বিষাক্ত বাতাস থেকে বাঁচাবে শ্রমিক, কর্মচারীদের। সেই শুরু। তৈরি হয়েছিল এন৯৫ মাস্ক। পরবর্তীকালে এই মাস্কই চিকিৎসা সরঞ্জামের এক অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। বর্তমানে কোভিড সংক্রমণ ঠেকাতেও এই এন৯৫ মাস্কের চাহিদাই তুঙ্গে।
তাইওয়ানের গবেষক, আবিষ্কর্তা পিটার সাই যদিও বলেন তিনি একা এই মাস্কের আবিষ্কর্তা নন। এই আবিষ্কার ছিল সকলের মিলিত প্রয়াস। তবে, এন৯৫ মাস্কের সঙ্গে বিজ্ঞানী পিটার সাইয়ের নামই জুড়ে আছে। শুধু মাস্ক তৈরিই নয়, ২০১৮ সালে এন৯৫ মাস্ককে জীবাণুমুক্ত করার বিশেষ পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। পেশা থেকে অবসর নিয়েছেন বহুদিন, তবে বর্তমানে কোভিড মহামারী কালে ফের পূর্ণ উদ্যোমে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ৬৮ বছরের গবেষক। করোনা মুক্ত করে ফের কীভাবে এন৯৫ মাস্ককে পুনর্ব্যবহার করা যাবে সেই কৌশল সামনে এনেছেন পিটার সাই।
তাইওয়ানের চাষীর ছেলে হয়ে ওঠেন আমেরিকার নাম করা গবেষক
তাইচুঙের কিংশুই জেলায় জন্ম। গরিব চাষীর ঘর। অভাব প্রচণ্ড। তাইচুং মিউনিসিপ্যাল চিংসুয়েই সিনিয়র হাই স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন পিটার। রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা শুরু হয় কলেজে। তাইপেই ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বর্তমানে যার নাম ন্যাশনাল তাইপেই ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি) থেকে কেমিক্যাল ফাইবার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিগ্রি পান। পড়াশোনার থেকে তখন চাকরি বেশি জরুরি ছিল পিটার ও তাঁর পরিবারের কাছে। তাইওয়ান টেক্সটাইল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজে যোগ দেন। কিন্তু গবেষণার নেশা ছিল দুরন্ত। চাকরি ছেড়ে কয়েক বছরের মধ্যেই আমেরিকা পাড়ি দেন তরুণ পিটার। কেনসাস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শুরু হয় পড়াশোনা। অঙ্ক, রসায়ন, পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন বিভাগে ৫০০ ক্রেডিট নিয়ে পাশ করেন পিটার। পরে ইউনিভার্সিটি অব টেনেসিতে গবেষণা ও অধ্যাপনা পাশাপাশি চলতে থাকে।

পিটার বলেছেন, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেটিরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিকাল ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এও গবেষণা আছে তাঁর। টেনেসি ইউনিভার্সিটিতেই ১৯৯২ সালে এন৯৫ মাস্ক তৈরি করেছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে অবসর নেন। তবে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পরে ফের নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করেছেন গবেষক পিটার সাই।
কোভিড রুখতে গবেষকের ‘করোনা চার্জিং’ পদ্ধতি
করোনাভাইরাস তখনও হানা দেয়নি। ২০১৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব টেনেসিতেই একটি নতুন গবেষণার শুরু করেছিলেন পিটার। দূষিত বাতাস শুদ্ধিকরণের জন্য ‘হাইড্রো ট্রাইবোইলেকট্রিফিকেশন’ পদ্ধতি সামনে আনেন তিনি। বৈদ্যুতিং চার্জের মাধ্যমে বাতাসের দূষিক কণা ছেঁকে বার করার এই পদ্ধতিই যে কোনও বস্তুকে কোভিড মুক্ত করার কাজে লাগবে বলেও জানিয়েছেন গবেষক পিটার। তিনি বলেছেন, এন৯৫ মাস্ক এবং ওই জাতীয় যে কোনও মাস্ককে ৬০ মিনিট ধরে ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় তাপ দিলে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা যে কোনও প্যাথোজেন নির্মূল হবে। আলট্রাভায়োলেট রশ্মির বদলে এই হিটিং টেকনোলজি অনেক বেশি নিরাপদ ও কার্যকরী। কারণ ইউভি-লাইট এন৯৫ মাস্কের পলিপ্রপিলিন মেটিরিয়ালকে নষ্ট করে দিতে পারে।

ইলেকট্রোস্ট্যাটিক চার্জিং বা যাকে গবেষক বলছেন ‘করোনা চার্জিং’, এই হিটিং টেকনোলজির উপর নির্ভর করেই। গবেষক বলছেন, নির্দিষ্ট সময় ধরে মাস্কে বৈদ্যুতিক চার্জ দিলে তার মাইক্রোফাইবারগুলো জীবাণুমুক্ত হতে পারে। বাতাসের যে কোনও ক্ষতিকর দূষিত কণা, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা প্যাথোজেন মাস্কের এই মাইক্রোফাইবারে আটকে থাকে। ফলে বার বার ব্যবহার করলে এই ফাইবারগুলোতে সংক্রামক জীবাণুর ভিড় বাড়তে থাকে। তখন হয় তাকে সঠিক উপায় স্যানিটাইজ করতে হয়, না হলে ফের নতুম মাস্ক কেনার প্রয়োজন হয়। আর দামি এন৯৫ মাস্ক বারে বারে কিনে ব্যবহার করার সামর্থ অনেকেরই নেই। পিটার বলছেন, করোনা চার্জিং পদ্ধতিতে ৭০ ডিগ্রিতে তাপ দিলে এই মাইক্রোফাইবারগুলো পরোপুরি জীবাণুমুক্ত হতে পারবে। শুধু মাস্ক নয় পিপিই, ফেস-শিল্ড ও অন্যান্য সুরক্ষার সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার সহজ পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা করছেন তিনি।