
শেষ আপডেট: 20 January 2021 13:59
কারাকোরামের সাসের কাংরি ফোর (৭৪১৫ মিটার) শৃঙ্গ অভিযানে গিয়ে ক্রিভাসে নিখোঁজ পেমবা শেরপার সঙ্গে উপস্থিত সঙ্গীরা এমনটাই জানাচ্ছেন। নিখোঁজ পেমবার ভাইপো, ওই দলেরই সদস্য পেমবা শিরিং জানান, মুহূর্তে তলিয়ে যান কাকা। সঙ্গে সঙ্গে নামার চেষ্টা করেন বাকি শেরপারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পেমবার নিজের দাদা পাসাং শেরপাও। দড়ি ছিল না সঙ্গে, কারণ সেগুলো সঙ্গে নিয়েই পড়ে গিয়েছেন পেমবা শেরপা। প্রায় খালি হাতেই তুখোড় দক্ষতা ও গভীর অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রায় ২০-২৫ ফুট গভীর পর্যন্ত নামেন তাঁরা। খোঁজেন পেমবাকে। কিন্তু খুঁজে পাওয়া দূরের কথা, কোনও সাড়া পর্যন্ত মেলেনি! ক্যাম্প ওয়ানে নেমে এসে, দড়ি ও সরঞ্জাম নিয়ে ফের যাওয়া হয় দুর্ঘটনাস্থলে। আরও নীচে নেমে খোঁজা হয় পেমবা শেরপাকে। কিন্তু এতই অন্ধকার এবং সঙ্কীর্ণ গহ্বর, একটা সময়ের পরে আর সম্ভব হয় না কিছুই। খবর দেওয়া হয় নীচে, বেস ক্যাম্পে। সেখান থেকে খবর যায় আরও নীচে, গাড়ির রাস্তা পর্যন্ত। ওই পথেই অভিযানে আসা আইটিবিপি টিমের শেরপারাও খবর পেয়ে রওনা দেন। চেষ্টা চলে উদ্ধারের। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পেমবা শিরিং।
তাই দুর্ঘটনার পরে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও এখনও অন্ধকারে উদ্ধারকাজ। অভিজ্ঞতা বলছে, যদি না কোনও মিরাকেল হয়, এতটা সময়ে বরফের গভীরে বেঁচে থাকা কার্যত অসম্ভব। তার উপরে সম্ভবত ওই ক্রিভাসের নীচে জল রয়েছে বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞ আরোহীরা। আর সেই জলে এক বার পড়ে গেলে উঠে আসার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
আরও পড়ুন: পাহাড়ে পেমবাজি সঙ্গে থাকলে বিপদ ধার ঘেঁষত না
২০ জুন ‘মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন অফ কৃষ্ণনগর’-এর সদস্য হিসেবে সাসের কাংরি ফোর অভিযানে গিয়েছিলেন দার্জিলিঙের পেমবা শেরপা। দলনেতা ছিলেন বর্ষীয়াণ এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী বসন্ত সিংহরায়। ক্লাব সূত্রের খবর, এই অভিযানে নিছক সহযোগী শেরপা নয়, সদস্য আরোহী হিসেবেই ভূমিকা ছিল তাঁর। এই বছরেই নিয়ম মেনে সেই ক্লাবের সদস্য হয়েছিলেন তিনি। ক্লাবের পরিচালন সমিতির সদস্য অশোক রায় বলেন, “শুক্রবার রাতে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন (আইএমএফ) এবং রাজ্য সরকারের যুবকল্যাণ দফতরের পর্বতারোহণ শাখার মুখ্য উপদেষ্টা দেবদাস নন্দীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ওঁরা উদ্ধারকাজ তরান্বিত করার আশ্বাস দেন।”
আরও পড়ুন: তুষার-গহ্বরে তিন দিন নিখোঁজ পেমবা, আশার আলো ক্ষীণ
আইএমএফ সূত্রের খবর, তাঁদের নিজস্ব কোনও রেসকিউ টিম নেই। তাই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা ওই একই এলাকায় অন্য একটি শৃঙ্গ, মাউন্ট প্ল্যাটো অভিযানে যাওয়া ইন্দো-তিবেতান সীমা পুলিশ (আইটিবিপি)-র সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার অনুরোধ করেন। কিন্তু ক্যাম্প ওয়ান অবধি পৌঁছনোটাও সময়সাধ্য ব্যাপার। আর পাহাড়ে এ ধরনের যে কোনও দুর্ঘটনায় সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, অমূল্য সময়। এক একটা মুহূর্ত পেরিয়ে যাওয়া মানে, বাঁচার সম্ভাবনা কয়েক গুণ করে কমে যাওয়া।
[caption id="attachment_19039" align="aligncenter" width="960"]
সাসের কাংরির পথ, দেবরাজ দত্তের থেকে পাওয়া ছবি।[/caption]
পেমবার পরিবারের তরফে প্রশ্ন উঠেছে, হেলিকপ্টারের আয়োজন করে আরও দ্রুত উদ্ধারকাজ চালালে বা নতুন কোনও উদ্ধারকারী দল পাঠালে পরিস্থিতি আর একটু অনুকূল হতো কি না। পেমবার ভাইপো দাওয়া গ্যালজিং শেরপার বক্তব্য, “But if IMF can send rescue team in helicopter on time my uncle can back to home but I can't understand why IMF and west Bengals government does not care to save mountaineer’s life.”
আইএমএফ যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছিল বলেই জানিয়েছে। রাজ্য সরকারের যুবকল্যাণ দফতরের পর্বতারোহণ শাখার মুখ্য উপদেষ্টা দেবদাস নন্দী জানান, খবর পাওয়া মাত্র সরকারের উঁচু মহলে জানানো হয়েছে। যোগাযোগ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রশাসনের সঙ্গেও। হেলিকপ্টার রেসকিউ তখনই সম্ভব, যখন আদৌ খোঁজ পাওয়া যায় অভিযাত্রীর। রাজ্যের যুবকল্যাণ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস অবশ্য বলেন, “দুর্ঘটনার খবর শুনেছি। বিস্তারিত এখনও জানি না।” ফলে ধরে নেওয়া যায়, সোমবারের আগে সরকারের তরফে আলাদা করে কোনও পদক্ষেপ করা সম্ভব হবে না।
আরও পড়ুন: পাহাড়ে একটা ভুলই হয়তো শেষ ভুল, শিখিয়েছিলেন পেমবাজি
[caption id="attachment_19023" align="aligncenter" width="859"]
সস্ত্রীক পেমবা শেরপা।[/caption]
এই মুহূর্তে পর্বতারোহণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব, ৪৫ বছরের পেমবা শেরপার বাড়ি দার্জিলিংয়ের ঘুমে। আট বার এভারেস্ট (৮৮৪৮ মিটার), দু’বার চো ইউ (৮২০১ মিটার), এক বার করে কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮৫৮৬ মিটার), মাকালু (৮৪৮১ মিটার), মানাসলু (৮১৫৬ মিটার), অন্নপূর্ণা (৮০৯১ মিটার) শৃঙ্গ ছুঁয়েছেন পর্বতারোহীদের নিয়ে। এছাড়াও অসংখ্য সাত-হাজারি ও ছ’হাজারি শৃঙ্গে পা রেখেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের পর্বতারোহী মহলের সদস্যরা এক বাক্যে স্বীকার করছেন, আজ বাংলার পর্বতারোহণ যে গর্ব লাভ করেছে, প্রতি বছর যে উঁচু শৃঙ্গ ছুঁয়েছেন বাঙালি আরোহীরা, তার অনেকটা কৃতিত্ব এই পেমবা শেরপার। একটু সুপরিচিত, সফল, সুউচ্চ শৃঙ্গ ছোঁয়া বাঙালি পর্বতারোহীদের প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই এক বা একাধিক অভিযানে সামিল হয়েছেন পেমবা শেরপা। দক্ষ এই শেরপা একাধিক বার দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করেছেন আরোহীদের, পথ খুলে দিয়েছেন কঠিন আরোহণের।
ক্লাব সূত্রের খবর, সাসের কাংরি শৃঙ্গ ছুঁয়ে তাঁরা যখন নামছেন, তখন বেস ক্যাম্প থেকে নীচের দিকে রওনা দেন দলনেতা বসন্ত সিংহরায়। নীচ থেকে টিম মেম্বারদের সুরক্ষিত ভাবে নামতে দেখেই এগোন তিনি। ভাবতেও পারেননি, অতটা নীচে নামার পরে, প্রায় ক্যাম্প ওয়ান পৌঁছে যাওয়ার পরে ঘটে যাবে এত বড় বিপদ! তাঁর কথায়, “ফেরার পথ তেমন বিপদসঙ্কুল ছিল না। বিশেষ করে পেমবার মতো অভিজ্ঞ শেরপা কী ভাবে বরফের ফাটলে পড়ে গেলেন তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না।”
[caption id="attachment_19024" align="aligncenter" width="772"]
এভারেস্টের চুড়োয়।[/caption]
২০১১ সালে সাসের কাংরি ক্লাইম্ব করা এবং ওই এলাকায় আরও কয়েক বার অভিযানে যাওয়া পর্বতারোহী দেবরাজ দত্ত জানান, ওই অঞ্চলের হিমবাহ তেমন খাড়াই নয়। কিন্তু ক্রিভাস প্রচুর। “আমরা যখন গিয়েছি, ক্রিভাস এড়িয়ে এড়িয়ে জ়িগজ়্যাগ পথে হাঁটতে হয়েছে। ক্রিভাসগুলোয় জলও থাকে। এই অবস্থায় হেলিকপ্টার বা নতুন উদ্ধারকারী দল—সবই ব্যর্থ হবে। কিছু করার থাকলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত শেরপারাই করতে পারতেন।”
একই মত দেবাশিস বিশ্বাসের। এভারেস্ট-সহ একাধিক আট হাজারি শৃঙ্গ ছোঁয়া এই পর্বতারোহীর বক্তব্য, “যা হয়ে গেল, তা অপূরণীয় ক্ষতি। ওঁর মতো দক্ষ ও অভিজ্ঞ আরোহীর এমন পরিণতি ভাবা যায় না। দুর্ঘটনা এটাকেই বলে। যেটার কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না, যেটার জন্য সরাসরি কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। যেটায় ‘কী হলে কী হতো’ নামের সংশয় প্রকাশ করার কোনও অবকাশ থাকে না।” তবে তাঁর আক্ষেপ, এত বড় এক জন আরোহীর জন্য বাংলার পর্বতারোহণ মহলে যতটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চোখে পড়ার কথা ছিল, তার অভাব রয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘আরোহী’ দেবাশিসকে তিলে তিলে গড়েছে এই পেমবা শেরপাই
দেবরাজ দত্তও বললেন সেই কথাই। “ঠিক এমন দুর্ঘটনাই যদি কোনও বিখ্যাত পর্বতারোহীর ক্ষেত্রে ঘটত, তা হলে কি সরকার থেকে শুরু করে পর্বতারোহী মহল, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম, সমস্ত মহলের সমস্ত স্তরে আরও বেশি তৎপরতা চোখে পড়ত না?”—প্রশ্ন তাঁর।
তবে পেমবা শেরপার জীবিত থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না পর্বতারোহী সত্যরূপ সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, "এর আগেও তুষারধসে চাপা পড়ে অনেক দিন বেঁচে থাকার ঘটনা ঘটেছে। সিয়াচেনের সেনা হনুমান থাপার ঘটনা এখনও ভুলিনি আমরা। পেমবাজি হয়তো চূড়ান্ত রকমের জখম, বা অজ্ঞান, তাই সাড়া মিলছে না। আরও পোক্ত উদ্ধারকারী দল পাঠানো অবশ্যই দরকার।" তিনি জানান, ক্রিভাসটা অনেক গভীর। কিন্তু পেমবাজির দক্ষতাও কম নয়। উনি শেরপা, জন্মগত যোদ্ধা। সহজে হাল ছাড়বেন না। কোনও ভাবে এক বার পৌঁছনো গেলে হয়তো মিরাকেল ঘটবে!
[caption id="attachment_19452" align="aligncenter" width="960"]
এভারেস্টজয়ী বাঙালি পর্বতারোহী রুদ্রপ্রসাদ, মলয় ও সত্যরূপের সঙ্গে পেমবা শেরপা।[/caption]
বস্তুত, শেরপা সম্প্রদায়ের প্রতি এই অবহেলা নতুন নয়। না বাঙালি হিসেবে, না আরোহী হিসেবে মর্যাদা পান ওঁরা। মৃত্যু যেন রুটি-রুজির দায়ে পাহাড় চড়তে আর চড়াতে যাওয়ার বাই-প্রোডাক্ট তাঁদের কাছে। প্রতিটা অভিযানে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেও, আরোহণ ইতিহাসে ট্র্যাজিক হিরো ছাড়া অন্য পরিচয় জোটে না। এমনকী আরোহী হিসেবেও জোটে না খ্যাতির মুকুট। পৃথিবীর কোন কোন প্রান্ত থেকে একের পর এক পর্বতারোহী দল নিরন্তর ছুটে আসে হিমালয়ে! বড় ভরসা এই শেরপারাই। কিন্তু ‘অভিজাত’ আরোহী মহল এখনও শেরপাদের সহ-অভিযাত্রীর চোখে দেখে না। তাঁদের পরিচয় স্রেফ শেরপা হিসেবেই। উচ্চতার সঙ্গী। বিপদের উদ্ধারকর্তা। জিনগত ভাবে রক্তে অতিরিক্ত লোহিত কণিকা থাকায় যাঁদের শরীরে অক্সিজেন বেশি প্রবাহিত হয়। তাই পাহাড় চড়াটা যাঁদের কাছে সহজতর। পয়সার বিনিময়ে যাঁদের সঙ্গে নিয়ে, যাঁদের দিয়ে মালপত্র বইয়ে, প্রয়োজনে যাঁদের পিঠে চড়েও উঁচু থেকে আরও উঁচু শৃঙ্গ জয় করে ফেলা যায়।
এরই মাঝে মাসুল গোনেন কেউ কেউ। দীর্ঘ হয় মৃতের তালিকা। আলোচনা বাড়ে মৃত্যু ঘটে যাওয়ার পরে। চিহ্নিত হয় গৌরব। যার শেষতম সংযোজন দার্জিলিঙের পেমবা শেরপা।
ছবি: পেমবা শেরপার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে পাওয়া।