
শেষ আপডেট: 16 July 2018 12:48
পর্বতারোহী মহলের আক্ষেপ, শুক্রবার দুর্ঘটনা ঘটার পরে এই উদ্ধারকাজ শনিবার সকালেই শুরু হওয়া উচিত ছিল। পেমবা শেরপা পড়ে যাওয়ার পরে যদি কোনও ভাবে বেঁচেও থাকতেন, যে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তা হলেও ৭২ ঘণ্টা বরফে আটকে থাকার পরে সে সম্ভাবনা তলানিতে ঠেকেছে। সরকারি ও বেসরকারি সমস্ত মহলের তৎপরতার অভাবেই এমনটা হল বলে মনে করছেন অনেকে। বস্তুত, পর্বতে ঘটে যাওয়া বিগত দুর্ঘটনাগুলির সঙ্গে এই দুর্ঘটনাকে তুলনা করলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কোনও বাঙালি পর্বতারোহীর সঙ্গে এমনটা ঘটলে সমস্ত মহলে অনেক বেশি উদ্বেগ তথা তৎপরতা প্রকাশ পেত। কিন্তু অভিযোগ, এ ক্ষেত্রে ‘শেরপা’ হয়েই থেকে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সেরা পর্বতারোহী, আট বার এভারেস্ট-সহ একাধিক আট-হাজারি শৃঙ্গ স্পর্শকারী পেমবা শেরপা।
[caption id="attachment_19343" align="alignnone" width="852"]
'টাচিং দ্য ভয়েড' সিনেমার দৃশ্য। এরকমই কোনও ক্রিভাসে আরও অনেকটা নীচে তলিয়ে গিয়েছেন পেমবা শেরপা।[/caption]
শুক্রবার দুর্ঘটনা ঘটার পরেই সঙ্গে সঙ্গে ক্রিভাস থেকে পেমবা শেরপাকে উদ্ধারের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন সঙ্গীরা। জানা যায়, সমস্ত ইকুইপমেন্ট এবং দড়ি পেমবার সঙ্গেই ছিল, সে সব নিয়েই তলিয়ে গিয়েছেন তিনি। ফলে উদ্ধারকাজ শুরু হয় এক রকম খালি হাতেই। পেমবার দাদা, অত্যন্ত দক্ষ পর্বতারোহী পাসাং শেরপাও ছিলেন ঘটনাস্থলে। বাকিদের নিয়ে প্রায় ২০-২৫ ফুট নামলেও কোনও খোঁজ পাননি ভাইয়ের। সাড়াও মেলেনি একেবারেই। খবর আসে, ক্রিভাসের ভিতরে অন্ধকার এবং সঙ্কীর্ণ। সোজা নামেনি ক্রিভাস, এঁকেবেঁকে গিয়েছে। ফলে এগোনো সম্ভব হচ্ছে না শেরপাদের পক্ষে।
[caption id="attachment_19352" align="alignright" width="457"]
পেমবা শেরপার দাদা পাসাং শেরপা।[/caption]
এভারেস্টজয়ী এবং সফল সেভেন সামিটার পর্বতারোহী সত্যরূপ সিদ্ধান্ত বলছেন, “ক্রিভাসের ভিতরে তো আলো জ্বলার কথা নয়! সে আলোর ব্যবস্থা হেডটর্চের সাহায্যে বা অন্য কোনও ভাবেই করতে হবে। ক্রিভাস তো সঙ্কীর্ণ হতেই পারে, বেঁকেও যেতে পারে। এটা তো তার স্বাভাবিক চরিত্র! এই ছুতোয় উদ্ধারের চেষ্টা হবে না! কপ্টার পৌঁছবে না? আলো পৌঁছোনো হবে না? ড্রিল করে ক্রিভাসে পৌঁছনোর চেষ্টা হবে না? ধরেই নেওয়া হবে মানুষটা বেঁচে নেই! আমার সঙ্গে বা পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোনও পরিচিত পর্বতারোহীর সঙ্গে কি এমনটাই হতো?”
[caption id="attachment_19350" align="alignleft" width="282"]
সত্যরূপ সিদ্ধান্ত[/caption]
আর এক এভারেস্টজয়ী এবং পাঁচটি সাত-হাজারি শৃঙ্গ ছোঁয়া বাঙালি পর্বতারোহী দেবরাজ দত্ত অবশ্য বলছেন, “সেরা এবং দ্রুততম সম্ভাব্য উপায়েই উদ্ধারকাজ ঘটেছে। পেমবা শেরপার নিজের দাদা পাসাং যেখানে উপস্থিত ছিলেন, সেখানে উদ্ধারের চেষ্টায় কোনও খামতি থাকার কথাই নয়। উপস্থিত টিমের সদস্যরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। দুর্ঘটনার খবর এসে পৌঁছনোর পরে বাইরে থেকে কোনও উদ্ধারকারী দলের ব্যবস্থা করে ঘটনাস্থলে পাঠাতে যা সময় লাগত, সে সময়ের সঠিক সদ্ব্যবহার করেছেন উপস্থিত সদস্যেরা। তার পর যদি কোনও চিহ্ন মিলত, তা হলে না হয় উদ্ধারকারী দল গিয়ে উদ্ধার করতে পারত।” দেবরাজ নিজে ওই অঞ্চলে বার তিনেক অভিযানে গিয়েছেন। অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, ওই এলাকার ক্রিভাসের যা চরিত্র, তাতে উদ্ধার এক রকম অসম্ভবই ছিল। ফলে ঘটনা যতই মর্মান্তিক হোক, আফশোস বা দোষারোপের জায়গা নেই।
আরও পড়ুন: পাহাড়ে পেমবাজি সঙ্গে থাকলে বিপদ ধার ঘেঁষত না
[caption id="attachment_19353" align="alignright" width="245"]
দেবরাজ দত্ত।[/caption]
রবিবার অবধি খবর ছিল, একই এলাকায় প্ল্যাটো শৃঙ্গে অভিযানে গিয়েছে ইন্দো-তিবেতান সীমা পুলিশের (আইটিবিপি) একটি দল। তাঁরা ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশনের (আইএমএফ) তরফে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন, হাত লাগিয়েছেন উদ্ধারকাজে। সোমবার জানা গিয়েছে, এমনটা আদৌ হয়নি। বস্তুত, হওয়ার কথাও নয়। পর্বতারোহণ সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা মানুষ মাত্রেই জানেন, একটি অভিযাত্রী দল এবং একটি উদ্ধারকারী দলের গঠন, চেহারা , প্রস্তুতি, সরঞ্জাম— মোটেই সমান নয়। ফলে অভিযানে আসা একটি দল আচমকা মাঝ পথে অন্য একটি শৃঙ্গের পথে উদ্ধারে চলে যাবে, এমনটা খুব সহজ নয়। আর যদি ধরেও নেওয়া হয় এমনটা করা যেত, তা হলেও রাস্তা থেকে সাসের কাংরি ক্যাম্প ওয়ান পৌঁছনো অন্তত দিন তিনেকের ব্যাপার।
[caption id="attachment_19354" align="alignleft" width="377"]
দিল্লিতে ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশনের দফতর।[/caption]
আইএমএফ-এর তরফে অপূর্ব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, আইটিবিপি-র ডিজি প্রেম সিং বলেন, “খবর পেয়ে আমরা আমাদের প্ল্যাটো অভিযাত্রী টিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। ফলে লে-র চৌকিতে মেসেজ পাঠাই।” সেখান থেকে যখন আটিবিপি-র অভিযাত্রী দল খবর পায়, তত ক্ষণে পেরিয়ে গিয়েছে দু’দিন। তাঁরা দুর্ঘটনাগ্রস্ত টিমের সঙ্গে যোগাযোগও করেন। কিন্তু তখন উদ্ধারের আশা আর নেই বলেই জানানো হয়। ফলে নিজেদের অভিযানেই এগিয়ে যায় ওই টিম। উদ্ধারে নয়।
আরও পড়ুন: রেখেছো শেরপা করে, আরোহী করোনি!
রাজ্য সরকারের তরফে রবিবার জানানো হয়েছিল, লে-র প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যে প্রশাসনিক ভূমিকা তেমন নেই, তা কি তাঁরা জানতেন না? কারাকোরাম রেঞ্জের সাসের কাংরি শৃঙ্গ প্রায় নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছ ঘেঁষেই অবস্থিত। ফলে বেশ কিছু সেনাবাহিনীর বেস রয়েছে সেখানে। প্রশিক্ষিত সেনা দল এবং আধুনিক সরঞ্জাম তাড়াতাড়ি পৌঁছলে উদ্ধারকাজ অনেকটা তরান্বিত হতো। অন্তত চেষ্টা হতো জোরকদমে। সেটা হলো ঠিকই, কিন্তু তিন দিন পরে। মাননীয় যুবকল্যাণ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, "খবর পেয়েছি, তবে বিস্তারিত জানি না। শুনেছি উদ্ধারকাজ চলছে।"
আরও পড়ুন: ‘আরোহী’ দেবাশিসকে তিলে তিলে গড়েছে এই পেমবা শেরপাই
প্রশ্ন উঠেছে, পাহাড়ে যে কোনও দুর্ঘটনায় এক একটা মুহূর্ত যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তা আর কবে শিখবে সরকার! আর কতগুলো দুর্ঘটনার পরে শিক্ষা নেওয়া হবে, একটি আপৎকালীন রেসকিউ টিম কতটা জরুরি?
[caption id="attachment_19356" align="alignleft" width="300"]
ন্যাফের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অনিমেষ বসু।[/caption]
হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশনের (ন্যাফ) প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অনিমেষ বসু বলছেন, বর্তমান সরকার অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের পৃষ্ঠপোষক। অভিযাত্রীদের নানা ভাবে সাহায্য করা হয় সরকারি ভাবে। সফল আরোহীদের সম্মানও জানানো হয় প্রায়ই। প্রতি বছর আয়োজন করা হয় বড় বড় অভিযানের। আধুনিক সরঞ্জামের ভাণ্ডারও বেশ পোক্ত। এভারেস্ট অভিযাত্রীদের পাঁচ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়াও শুরু হয়েছে কয়েক বছর ধরে। কিন্তু এই সব কিছুর সঙ্গে সঙ্গেই যে এক জন আরোহীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও দায়িত্বও নিতে হবে। দুর্গম পাহাড়ে অভিযানের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বা আশপাশে অবস্থিত চৌকিগুলির সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা মোকাবিলা করার চেষ্টা করাটাও অভিযানে উৎসাহ দেওয়ারই বৈশিষ্ট্য।
আরও পড়ুন: পাহাড়ে একটা ভুলই হয়তো শেষ ভুল, শিখিয়েছিলেন পেমবাজি
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পর্বতারোহণে একের পর এক দুর্ঘটনা এবং উদ্ধার কাজ নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ বারবার প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে দক্ষ অভিযাত্রীদের নিয়ে গঠিত সরকারি কমিটিকে। অনিমেষবাবুর মত, সমস্ত উদ্ধারের দায়িত্ব সরকারের পক্ষ েনেওয়া সম্ভব নয় এটা ঠিক। তবে এটা সুনিশ্চিত করা যেতে পারে, যে প্রতিটা টিম বড় অভিযানের আগে যেমন আইএমএফ-কে জানায় ও অনুমতি নেয়, তেমনই উদ্ধারকারী দলগুলির সঙ্গেও আগে থেকে কো-অর্ডিনেট করা উচিত। সেটা সংলগ্ন সেনা চৌকি হোক বা পর্বতারোহণ প্রতিষ্ঠান।
[caption id="attachment_19358" align="aligncenter" width="604"]
এ ভাবেই চলেছিল হনুমান থাপাকে উদ্ধারের কাজ।[/caption]
পেমবা শেরপার ক্ষেত্রে অবশ্য সেই গুরুত্বটুকুই দেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে সিয়াচেনে মোতায়েন সেনা হনুমান থাপার তুষারধসে চাপা পড়ে যাওয়ার ঘটনা এখনও টাটকা। একটানা চেষ্টায়, অসম আবহাওয়ার সঙ্গে যুঝে, অমানুষিক দক্ষতায় বেশ কয়েক দিন পরে জীবিত উদ্ধার হয়েছিলেন তিনি। মিরাকেল ঘটেছিল। পেমবা শেরপার ক্ষেত্রেও এমনটা হতেই পারত, দ্রুত চেষ্টা করলে। যদিও শেষমেশ প্রাণে বাঁচেননি থাপা, কারণ তত ক্ষণে বিকল হয়ে গিয়েছিল শরীরের ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
শেরপা জনজাতির মানুষেরা জন্মগত ভাবে লড়াইপ্রবণ, শক্তিশালী। পেমবা তাঁদেরই প্রতিনিধি। মিরাকেলের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সুযোগ প্রায় রইলই না বলতে গেলে।