মাত্র এক হাজার টাকার পেনশনের ভরসায়। দুই মেয়ে যতটা পারতেন সাহায্য করতেন।কিন্তু বৃদ্ধা নমিতা দেবী অসুস্থ হয়ে পড়তেই ভাড়া বাড়ির মালিক তাঁদের অন্যত্র উঠে যেতে বলেন। বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর একসময় গাছের তলায় রাত কাটাতে শুরু করেন বৃদ্ধ দম্পতি। তাঁদের এই অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে এগিয়ে আসে ‘সমব্যথী সমাজকল্যাণ সমিতি’।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গাছতলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য এক বৃদ্ধ দম্পতি
শেষ আপডেট: 18 October 2025 18:36
কাজল বসাক, নদিয়া: জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গাছতলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য এক বৃদ্ধ দম্পতি। অথচ তাদের নিজের বাড়ি, নিজের জমি—সবই ছিল। নেই শুধু তাঁদের প্রতি সন্তানদের মায়া-মমতা।
কৃষ্ণগঞ্জের সত্যনগরের বাসিন্দা ৮৪ বছরের নিমাই শর্মা। পেশায় ছিলেন জুটমিলের কর্মচারী। স্ত্রী ৭৮ বছরের নমিতা শর্মা। কষ্টে-সুখে দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে বড় করে তোলেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। সংসারী করেছেন দুই ছেলেকেও। বাকি জীবনটা শান্তিতে কেটে যাবে বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু শান্তির বদলে মিলল যন্ত্রণা। বৃদ্ধ দম্পতি ভেবেছিলেন, ছেলেরা তাদের শেষ বয়সে ভরসা হবে। তাই ভালোবাসার টানে জমি বাড়ি দুই ছেলের নামে লিখে দেন। কিন্তু সেই সম্পত্তিই তাদের জীবনে কাল হল।
বড় ছেলের একটি বিশেষভাবে সক্ষম কন্যা থাকায় দাদু স্নেহভরে তার নামে সামান্য দু’শতক জমি দেন। তাতেই শুরু হয় পরিবারের অশান্তি। বড় ছেলে সীমারেখা টেনে পাঁচিল তোলেন জমির একাংশে। ছোটছেলে দাবি করে তাঁর জমিতে পাঁচিল তুলেছে দাদা। এই নিয়ে দুই ভাইয়ের ঝগড়া চরমে পৌঁছয়। ঝগড়ার মীমাংসা করতে গিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মা হয়ে ওঠেন দুই ছেলের কাছে অপ্রিয়। অপমান, গঞ্জনা, লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে বাড়ি ছেড়ে গ্রামের পাশেই ভাড়া ঘরে আশ্রয় নেন তারা। মাত্র এক হাজার টাকার পেনশনের ভরসায়। দুই মেয়ে যতটা পারতেন সাহায্য করতেন।কিন্তু বৃদ্ধা নমিতা দেবী অসুস্থ হয়ে পড়তেই ভাড়া বাড়ির মালিক তাঁদের অন্যত্র উঠে যেতে বলেন। বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর একসময় গাছের তলায় রাত কাটাতে শুরু করেন বৃদ্ধ দম্পতি। তাঁদের এই অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে এগিয়ে আসে ‘সমব্যথী সমাজকল্যাণ সমিতি’। সংস্থার সদস্যরা দুই ছেলেকে বোঝান। শেষ পর্যন্ত তাদের জমির এক কোণে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য একটি টিনের ঘর ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করেন।
এখন সেই টিনের ঘরই বৃদ্ধ দম্পতির মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই। ছেলেরা গাড়ি চালিয়ে স্বচ্ছল জীবন যাপন করলেও, বৃদ্ধ বাবা-মা তাদের কাছে বোঝা। সংস্থার সদস্য বিশ্বজিৎ প্রামাণিক জানান, “আমরা বৃদ্ধ দম্পতির খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা করছি। হোটেল থেকে নিয়মিত খাবার পাঠানো হবে। যেহেতু তারা কাজ করতে পারেন না, তাই তাদের জীবনে যেন অভাব না থাকে, সেই চেষ্টাই করছি।” আরেক সদস্য লিটন বিশ্বাস বলেন, “আমরা সমাজসেবামূলক কাজ করি। এই দম্পতির থাকার একটা ব্যবস্থা করতে পেরে সত্যিই আনন্দ হচ্ছে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনও পরিবারে এমন ঘটনা না ঘটে, সেই কামনা করি। আমরা চাই, একদিন যেন এই দুই ছেলে তাদের বাবা-মাকে ফের বুকে টেনে নেয়। ভুল সবাই করে, ক্ষমাই পরম ধর্ম।” ওই বৃদ্ধ দম্পতির এমন অবস্থায় উদ্বিগ্ন পড়শিরাও। স্থানীয় বাসিন্দা সন্তোষ দাস আক্ষেপ করে বলেন, “বাবা-মা সম্পত্তি দিয়ে আজ নিঃস্ব। ছেলে-মেয়েদের বোঝা উচিত, একদিন তাদের জীবনেও বার্ধক্য আসবে।”