দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা রোগীদের শরীরে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের কোনও কার্যকরী ভূমিকাই নেই। সংক্রমণ সারাতে পারে না এই ওষুধ, এমনকি সঙ্কটাপন্ন কোভিগ রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকিও কমাতে পারে না, ক্নিনিকাল ট্রায়ালের রিপোর্টে এমনটাই দাবি করেছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি।
গত মে মাসেই করোনা চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ট্রায়াল শুরু করেছিল অক্সফোর্ড। গবেষকরা জানিয়েছিলেন, দুইভাবে এই ওষুধের ট্রায়াল চলবে। প্রথমত প্রফিল্যাক্সিস ড্রাগ হিসেবে এই ওষুধের ট্রায়াল হবে। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি যাঁদের সবচেয়ে বেশি তাঁদের উপরে প্রয়োগ করা হবে এই ওষুধ। দ্বিতীয়ত, করোনা রোগীদের এই ওষুধ খাইয়ে তার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এই ক্লিনিকাল ট্রায়ালের রিপোর্ট সামনে এনেই অক্সফোর্ডের গবেষকরা দাবি করেছেন, হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের উপরে কন্ট্রোলড ট্রায়াল করা হয়েছিল হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের। কিছু রোগীকে এই ওষুধ খাওয়ানো হয়, বাকিদের হয়নি। যাদের হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে ২৬% রোগীরই মৃত্যু হয়েছে। অক্সফোর্ডের অধ্যাপক এবং এই ক্লিনিকাল ট্রায়ালের চিফ ইনভেস্টিগেটর পিটার হর্বে বলেছেন, দুঃখের বিষয় কোভিড সারাতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের কোনও ভূমিকাই দেখা যায়নি। বরং এই ওষুধের ডোজের কমবেশি করে দেখা গেছে অনেকের শরীরেই নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ড্রাগের অ্যাডভার্স সাইড এফেক্ট হয়েছে।
করোনা চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে তর্জা চলছেই। কোভিড সংক্রমণ সারাতে ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধকের সত্যি কোনও কার্যকরী ভূমিকা আছে কিনা সেই নিয়ে প্রামাণ্য তথ্য এখনও মেলেনি। ল্যানসেটের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছিল, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সাইড এফেক্ট রয়েছে। বিশেষ করে হার্ট এরিদমিয়া দেখা দিতে পারে। ল্যানসেটের গবেষণায় বিশ্ব জুড়ে কয়েকশ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৯৬ হাজার রোগীর রেকর্ড খতিয়ে দেখে সেই রিপোর্ট সামনে আনা হয়েছিল। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে শুরুতে এই ওষুধের ট্রায়াল বন্ধের নির্দেশ দিলেও পরে ফের এই ওষুধের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে অনুমতি দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। হু-র চিফ সায়েন্টিস্ট সৌম্য স্বামীনাথন বলেন, “নানারকমভাবে ওষুধের ট্রায়াল চলছে। তার ফল ভিন্ন হতেই পারে। সেইজন্যই, বিজ্ঞানের গবেষণায় কোনও ড্রাগ বা ভ্যাকসিনের একবার ট্রায়াল করেই সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। বারে বারেই এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ডেটা খতিয়ে দেখে তবেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা প্রয়োজন।”
করোনা রোগীদের উপরে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি তুলেছিল মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও। এফডিএ বলেছিল, এই ওষুধ খেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ আগে থেকেই রয়েছে যাঁদের, তাঁরা যদি নিয়ম না মেনে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন খান তাহলে মৃত্যু অবধি হতে পারে। এফডিএ এমনও দাবি করেছিল, ওষুধের মাত্রা যদি ২ গ্রামের বেশি হয়ে যায়, তাহলে সেটা রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ভারতে আবার ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল জার্নাল (আইসিএমআর) অন্য রকম যুক্তি দিয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল রিসার্চ’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে আইসিএমআরের বিজ্ঞানীরা ল্যানসেটের তথ্য উল্লেখ করেই বলেছেন, কোভিড রোগীদের উপরে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইনের প্রভাব নেই এটা অমান্য করা যাচ্ছে না, এই ওষুধের ডোজের হেরফেরে রোগীদের মৃত্যুহার বাড়তে পারে সেটাও অনেকটাই ঠিক, তবে এই ওষুধে করোনা সারাবার বদলে করোনা প্রতিরোধ কী ভাবে গড়ে তোলা যায় সেটাই গবেষণার বিষয়। আইসিএমআরের দাবি, করোনার ঝুঁকি বেশি এমন স্বাস্থ্যকর্মীদের বেশি ডোজে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দিয়ে দেখা গেছে তাঁদের সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। কোভিড রোগীদের বদলে কোভিড সংক্রমণের ঝুঁকি যাদের বেশি সেই হাই-রিস্ক গ্রপের মধ্যে প্রফিল্যাক্সিস ড্রাগ হিসেবে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ব্যবহার চলতে পারে। ডেটা দিয়ে আইসিএমআর দেখিয়েছে যে, কোভিড রোগীদের সংস্পর্শে থাকা ডাক্তার-নার্স ও যে স্বাস্থ্যকর্মীদের হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন খাওয়ানো হয়েছিল তাদের অনেকেরই নাকি সংক্রমণের ঝুঁকি কমেছে, কোভিড রিপোর্টও নেগেটিভ এসেছে।