
শেষ আপডেট: 13 November 2019 13:57
অটো রিকশায় উঠতে যাব। পিছু ডাকলেন সন্তোষ শর্মা। স্থানীয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা। চাপা গলায় বললেন, “দাদা আপনি নতুন লোক। ভাড়া ঠিক করে উঠবেন। এখানে ঠকে যাওয়ার খুব ভয়।” লজ্জা মুখে ভাড়ার কথা বলে নেওয়ার কথা দিলাম। আর মনে মনে বললাম, কোন তীর্থে আর মানুষ না ঠকে এসেছে। বড় পুণ্য পেতে গিয়ে ছোট ছোট ঠকার কথা কি মাথায় রাখলে চলে!
অটোর দৌরাত্ম্য অযোধ্যাতেও। প্রথমবার আসা আর সবাইয়ের মতো আমাকেও ঠকতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। একশ টাকা ভাড়ায় রফা করে অটোওয়ালা যে দূরত্ব নিয়ে গিয়েছেন তা মেরেকেটে কুড়ি টাকার। বার চারেক ঠকে পঞ্চমবার সজাগ হয়েছি। আসলে এটা দিয়েই অযোধ্যা বুঝিয়ে দিয়েছে সে আলাদা নয়। আর পাঁচটা তীর্থের মতোই। আর এ ব্যাপারে তো উল্টোডাঙার সঙ্গেও অযোধ্যার কোনও ভেদ নেই।
পর্যটক ঠকানোর কথা সরাসরি স্বীকারও করলেন অটোচালক রামবিলাস। সোজা কথা, “এখানে লোকাল লোক তো হেঁটেই চলে। রোজগার বলতে তো বাইরের লোক। একটা রিজার্ভ পার্টি পেতে সারাদিন লেগে যায়। পয়সা বেশি না নিলে চলবে কী করে।” রামবিলাস চান তাড়াতাড়ি রামমন্দির হোক। কারণ, তাতে অনেক লোক আসবে। নতুন মন্দির দেখতে যেমন লোক আসবে তেমন মসজিদ দেখতেও আসবে। দুটো একসঙ্গেই হয়ে যাক। গোটা পৃথিবীর লোক আসবে মন্দির-মসজিদ দেখতে।
রামবিলাস যেটা মুখে বললেন সেটা অনেকেরই মনের কথা। সরযূর পারে ফুল নিয়ে বসা মেয়েটি, বাছুর হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গো-মাতা পূজারি, মণিরামদাস ছাউনির সামনে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে আধশোয়া বৃদ্ধ—সকলেরই মনের কথা, তাড়াতাড়ি হোক মন্দির। তবেই তো আসবে ‘অচ্ছে দিন’.
পয়সা, স্বাভিমানের পরেও একটা ভাগ আছে অযোধ্যার। সে ভাগের নাম ভক্তি। সেই ভক্তি আবার বীররসের। রামভক্তরা তাই আদালতের রায়ে সব মীমাংসা হয়ে যাওয়ার পরেও অধিকার নিয়ে যেন খড়্গহস্ত। দাবিও যেন মুখস্থ—শ্রীরামজন্মভূমি অযোধ্যা। আজ থেকে নয়, সেই ত্রেতা যুগ থেকে সেখানে হিন্দুদের অধিকার। রামলালা খুবই কষ্টে আছেন। তাঁকে ভব্য মন্দির দিতেই হবে।
এমনই এক ভক্ত সতপাল দাস। দিনভর ঘুরে বেড়ান অযোধ্যার পথে পথে। বয়স আশির আশপাশে। ভিক্ষার ঝুলি একটা আছে বটে তবে কেউ কিছু দিল কি দিল না তাতে কিছুই আসে যায় না। রামলালা ঠিক কিছু জুটিয়ে দেবেন এমন ভাব নিয়ে পথেই সংসার। রাতটা কাটে রঘুবীর দাসের কুর্সিবাড়ির বারান্দায়। তাঁর দাবি, সুপ্রিম কোর্ট নয়, রায় দিয়েছেন খোদ রঘুবীর। তিনিই তো দুনিয়া চালান। তিনিই ঠিক করেন দিন-রাত। তিনিই বলে দেন মন্দির-মসজিদ। এমনই তাঁর কৃপা।
কথা শুনে মনে মনে হাসছিলামও। সতপাল যেন টের পেলেন সেটা। আমার দিকে মুখ করে তিনিও মিটিমিটি হাসলেন। ঠিক যেন পড়ে ফেলেছেন অবিশ্বাসীর মন। তবে অন্যের বিশ্বাস বা অবিশ্বাসে তাঁর কী-ই বা যায় আসে!
আসলে অর্থ, মোক্ষ, স্বাভিমান যাই বলি না কেন, বিশ্বাসই অযোধ্যাচরিতের গূঢ় কথা। রামজন্মভূমি থেকে সরযূ তীর কিংবা পরিক্রমা মার্গ—সর্বত্রই বিশ্বাস, বিশ্বাস আর বিশ্বাস। সব থেকে বড় বিশ্বাস—ত্রেতা যুগে এই নগরীতেই জন্মেছিলেন দশরথ-কৈকেয়ীর সন্তান রামচন্দ্র।