
শেষ আপডেট: 2 September 2021 12:53
আকাশ ঘোষ
উত্তর কলকাতার (North Kolkata) কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিটের একটি বাড়ির সামনে মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎই এসে থামল এক সরকারি গাড়ি। গাড়ি থেকে নামলেন তিন-চার জন। প্রতিবেশীদের মধ্যে কৌতূহল, হটাৎ এত লোকের আগমণ কেন এ বাড়িতে? কৌতূহলের নিরসন ঘটল কিছুক্ষণ পরেই। তার আগে জেনে নেওয়া ভাল ৪০এ, কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিটের এই বাড়িটির ইতিহাস। এই বাড়িতেই থাকতেন মৃৎশিল্পী গোপেশ্বর পাল (Gopeswar paul) বা জি পাল। কে তিনি? মানুষকে একবার দেখা মাত্রই মাটি দিয়ে তাঁর অবিকল প্রতিকৃতি তৈরি করে ফেলার অসামান্য ক্ষমতা ছিল এই মৃৎ শিল্পীর। যে গুণের কথা বিশ্বাসও করেননি সেই সময়ের ইংরেজরা। কিন্তু ভ্রম কাটে কয়েক মিনিটের মধ্যেই। তাঁদের কয়েকজনের প্রতিকৃতি বানিয়ে তাক লাগিয়ে দেন তিনি।
মনের আনন্দে একাকী ঘরে বসে মূর্তি তৈরি করতেন তিনি। তৈরি করলেন নিজের স্টুডিও। সেই কাজ নিয়েই মেতে থাকতেন। একের পর এক বিখ্যাত মানুষের মূর্তি গড়ে উঠত তাঁর হাতে। প্রায় ১০০ বছরের পুরনো এই অভূতপূর্ব সৃষ্টিশালা আজ হেরিটেজ স্বীকৃতি পেতে চলেছে।
সেই স্বীকৃতি দেওয়ার আগে জি পালের স্টুডিও তদারকি করতে আসেন রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের লোক জন। আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষার পরই কুমোরটুলির এই স্টুডিও পেতে চলেছে হেরিটেজের তকমা। কুমোরটুলির বুকে এই প্রথম কোনো মৃৎশিল্পের কাজ স্বীকৃতি পেতে চলেছে। যদিও কুমোরটুলি এখনও হেরিটেজ জোনের স্বীকৃতি পায়নি।
বাগবাজারের মদন মোহন মন্দিরের উল্টোদিকের রাস্তায় কিছুটা এগোলে বাঁ হাতের গলিই হল কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিট। সেই গলির শেষ প্রান্তের বিশাল বাড়ির মাথায় চোখ পড়লেই দেখা যায় জি পাল এন্ড সন্স (G paul & sons) লেখা ফলক। তারই বিপরীতে আছে জি পালের তৈরি প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো স্টুডিও।
আরও পড়ুনঃ লাল ঝান্ডা উঠে যাচ্ছে, মুছে যাচ্ছে কাস্তে-হাতুড়ি, পতাকা বদলের পথে বামদল
লোহার দরজা খুলে মুখেই আছে ছোট বড় কিছু গাছের সম্ভার। এক মহিলার মূর্তিও শোভা পাচ্ছে সেখানে। আর দরজা পেরিয়ে স্টুডিওতে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে থরেথরে সাজানো মূর্তি। কী নেই সেখানে। রামকৃষ্ণদেব, সারদা মা, বিবেকানন্দ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজা মহারাজার প্রতিকৃতি। আছে গোপেশ্বর পালের তৈরি প্রথম কাজ বিশুদ্ধানন্দ সরস্বতীর মূর্তি। তার সঙ্গেই শোভা পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি না শেষ হওয়া মূর্তিও।
শহরের বুকে গণ্যমান্য বহু ব্যক্তির প্রতিকৃতি এই জি পাল এন্ড সন্স-এর স্টুডিওতেই তৈরি। রামকৃষ্ণ মিশনের অধিকাংশ কাজই হয় এই স্টুডিওতে। করুনার জন্য স্টুডিও এখন বন্ধ। সারা দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ রামকৃষ্ণ মিশনের যত মূর্তি এই স্টুডিওতেই তৈরি হয়, এমনই জানালেন গোপেশ্বর পালের ছোট শ্যালক ব্যোমকেশ পাল। তিনিও একজন শিল্পী।
গোপেশ্বর পালের পুত্র ছিলেন সিদ্ধেশ্বর পাল। নিসন্তান সিদ্ধেশ্বরের মৃত্যুর পরেই এই দায়িত্ব এসে পড়ে ব্যোমকেশ পালের কাঁধে। সেই থেকেই সামলাচ্ছেন এই স্টুডিওর কাজ। তাঁর ইচ্ছা এই স্টুডিওর পাশেই গোপেশ্বর বাবুর কাজ দিয়ে মিউজিয়াম তৈরি করার। সেই ইচ্ছাই এবার পূরণ হতে চলেছে রাজ্য সরকারের হেরিটেজ কমিশনের হাত ধরে। হেরিটেজ তকমা পাওয়ার পরেই এটি মিউজিয়ামে পরিণত হতে পারে বলে আশাবাদী তিনি।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিশিষ্ট মানুষের মূর্তির খনি এটি। শিকাগোর বিবেকানন্দর যে বিখ্যাত মূর্তি আছে তারও প্রতিকৃতি এই স্টুডিওতে শোভা পাচ্ছে। পঞ্চম জর্জ থেকে শুরু করে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, চিত্তরঞ্জন দাস, রমেশচন্দ্র মিত্র সহ বিভিন্ন মানুষের প্রতিকৃতি আছে এই স্টুডিওতে। এমনকি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও এখানে এসে তিন দিন সিটিং দিয়েছিলেন তাঁর প্রতিকৃতি বানানোর সময়।
এই সম্মানে খুশি 'পুরোনো কলকাতা গল্প' নামের এক সামাজিক গোষ্ঠী। বলা চলে তাঁদের উদ্যোগেই এই স্বীকৃতি মিলতে চলেছে। ২০১৯ সালে বাগবাজারের অলি গলিতে হেরিটেজ ওয়াক করছিলেন গোষ্ঠীর সদস্যরা। জি পালের স্টুডিও দেখে আপ্লুত হন তাঁরা। এবার সেই স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশি 'পুরোনো কলকাতা গল্প' সোসাইটির অন্যতম স্বর্ণালী চট্টোপাধ্যায়।
আরও পড়ুনঃ ট্যাংরার বিস্ফোরণ থেকে শিক্ষা নিন, গ্যাস সিলিন্ডার থেকে কীভাবে সতর্ক থাকবেন জেনে নিন
তাঁর কথায়, "আমরা খুব আনন্দিত এই খবরে। পুরো কুমোরটুলিই এই সম্মান পাক। তবে এই কাজ দিয়ে শুরু হল। আগামীতেও কুমোরটুলির অনেক শিল্পীর ঘরে এই সম্মান গেলে খুশি হব।"
অনেক ছোট বড় গল্প আছে এই স্টুডিও ঘিরে। সেই স্টুডিওই আর কয়েকদিন বাদে শহরের ঐতিহ্যের পাতায় নাম লেখাতে চলেছে। গোপেস্বর মারা যান ১৯৪৫-এ। তাঁর সৃষ্টি ও কর্মস্থল ঐতিহ্যের মর্যাদা পেতে চলেছে ৭৬ বছর পর।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'