
শেষ আপডেট: 20 March 2023 14:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো, জলপাইগুড়ি: পিয়ালী আর কুন্তলের স্প্যারো হাউসে বিশ্ব চড়াই দিবসটি (World Sparrow Day) মহা সুখেই কাটাল চড়াই পাখির দল।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে চড়াই পাখির জুড়ি নেই। কিন্তু দ্রুত নগরায়ন এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর ফলে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে এই পাখি। তাই চড়ুই পাখি সংরক্ষণের বার্তা দিতে ২০১০ সাল থেকে ২০শে মার্চ দিনটিকে বিশ্ব চড়াই দিবস হিসেবে পালন করেন পরিবেশ কর্মীরা। সবুজ গাছ গাছালি ঘেরা জলপাইগুড়ি শহরও এখন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে কংক্রিটের জঙ্গলে। আধুনিক আবাসনগুলির ফ্ল্যাটের বারান্দায় রোদ্দুর আসে ঠিকই। কিন্তু সেখানে নেই কোনও ঘুলঘুলি। একদিকে কমছে গাছ অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে ঘুলঘুলি। বাসা বাঁধবার জায়গা না পেয়ে ক্রমেই বিদায় নিচ্ছে চড়াই পাখি।
এই পরিবেশেই আশার আলো জ্বালছেন জলপাইগুড়ি পুরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব বামনপাড়ার বাসিন্দা কুন্তল ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী পিয়ালী ঘোষ। তাঁদের তৈরি জলপাইগুড়ি স্প্যারো হাউস। সেখানে সকাল থেকে কিচির মিচির শব্দে ভরে ওঠে চারপাশ। নানা পাখির কলতানে ঘুম ভাঙে এই এলাকার বাসিন্দাদের। এই স্প্যারো হাউসে রয়েছে জাভা স্প্যারো, লাভ বার্ড, বেঙ্গলি, ফিঞ্চ সহ বিভিন্ন ধরনের পাখি। এদের সবার জন্য একটা করে বাসা আছে এই বাড়িতে। তবে মূলত চড়াই পাখির বাসার জন্যই পরিচিত হয়ে উঠেছে জলপাইগুড়ি পূর্ব বামনপাড়ার ঘোষ দম্পতির বাড়ি।
কুন্তল, পিয়ালী আর তাঁদের ছোট্ট ছেলে প্রায়নের আতিথেয়তায় এই বাড়িকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ভেবে নিয়ে দিনভর রাজত্ব চালায় কয়েকশো চড়াই, ঘুঘু, ফিঙে, বুলবুলি সহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় পাখি। বার্ড ফিডারে চাল রেখে দেন তাঁরা। সেই খেয়ে ছাদে লাফিয়ে বেড়ায় চড়াই, ঘুঘু, ফিঙেরা। পেট ভরিয়ে মাটির পাত্রে রাখা জল খেয়ে মনের আনন্দে উড়ে যায়।

শুধু চাল খেয়ে যাতে পাখিদের অরুচি না হয়, তার জন্য ছাদের ওপর টবে যত্ন করে লাগিয়েছেন আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, পেঁপে, লিচু, সবেদা-সহ নানা ফলের গাছ। রয়েছে টমেটো, লঙ্কা,পালংও। সেখানেও পাখিদেরই রাজত্ব। ভোর শুরু হয়ে যায় আসা-যাওয়া। বেলা গড়াতে আস্তে আস্তে কমে যায় পাখির সংখ্যা। ফের বিকেল হতেই ঝাঁক বেঁধে ফের তারা হাজির হয়ে যায় ঘোষ বাড়ির ছাদে। মনোরম সেই দৃশ্য দেখে চোখ ফেরানো মুশকিল।
পিয়ালী দেবনাথ ঘোষ পেশায় হাইস্কুলের শিক্ষিকা। তাঁর কথায়, “এই পাখিদের জন্য খুব বেশি কিছু করতে হয় না। খালি দিনে একবার একটা পাত্রে চাল ও একটা পাত্রে জল দিলেই হয়ে যায়। আর ছাদের গাছ গাছালি সামান্য পরিচর্যা করলেই বাড়িতে ঝাঁক বেঁধে পাখি চলে আসে।” এটুকু করতে বেশ ভালই লাগে তাঁর।
ছোটবেলা থেকে পাখিদের নিয়ে মেতে থাকেন কুন্তলও। কোনও অসুস্থ পাখি রাস্তায় পড়ে থাকলে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে এনে শুশ্রূষা করে আবার পরিবেশে ছেড়ে দিতেন। তিনি জানান, বছর দশেক আগে বিখ্যাত পরিবেশবিদদের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে জানতে পারেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং, নগরায়ণ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে গোটা বিশ্ব থেকে চড়াই পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সারা বিশ্বের সঙ্গে যার প্রভাব পড়েছে জলপাইগুড়িতেও। চড়াই সাধারণত থাকত ঘুলঘুলিতে। সেই ঘুলঘুলি না থাকায় বাসস্থান হারিয়ে তারাও হারাতে বসেছে। এরপরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন বাড়িতে চড়ুই পাখির বাসস্থান তৈরি করার। তিনি বলেন, “প্রথমে ছাদের কোণায় একটা পাত্রে চাল ও একটা পাত্রে জল দিয়ে রাখতাম। প্রথম প্রথম দু একটা চড়ুই পাখি আসত। কয়েক বছর যেতে এখন ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই সহ অন্যান্য পাখিরা আসছে।”
কুন্তলবাবুর আবেদন চড়ুই পাখিদের ফিরিয়ে এনে পরিবেশ রক্ষা করতে একমুঠো চাল আর একটু জল বাড়ির এক কোণে রাখলে হারিয়ে যাওয়া চড়াই ফিরে আসতে পারে আবার। পাখি না থাকলে পরিবেশের ভারসাম্যটাই যে নষ্ট হয়ে যাবে।