
শেষ আপডেট: 3 January 2022 06:06
গোয়া দখলের লক্ষ্যে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দু’বার ওই রাজ্য সফর করেছেন। দু’বারই তিনি ছোট্ট রাজ্যটির একাধিক মন্দিরে যান। গোয়ার খ্রিস্টান ভোটারদের কথা মাথায় রেখে গিয়েছেন চার্চেও।
তবে চর্চা শুরু হয়েছে তৃণমূলের দুই শীর্ষনেতার ভিন দুই রাজ্যে মন্দির সফর এবং অভিষেকের পুজো দেওয়ার পাশাপাশি পূজো করা নিয়ে। নেতাদের পুজো দেওয়ার দৃশ্য অবশ্য অচেনা নয়। রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরিওয়ালদের মন্দির সফর চোখ সওয়া হয়ে গিয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর থেকে তিনি কম বড় হিন্দু নন প্রমাণ দিতে রাহুল গান্ধী সারা বছর ধরে মন্দিরে পুজো দিয়ে বেড়ান। তিনিই একমাত্র নেতা যিনি একটি নির্বাচনে (২০১৮-র মধ্যপ্রদেশ বিধানসভা) জনসভার থেকে মন্দিরে গিয়েছেন বেশি। কোনও কোনও দিন গিয়েছেন দুটি মন্দিরেও।
tmc
কিন্তু বাংলায় বিজেপি বাদে বাকি রাজনীতিকদের এমন ঘটা করে পূজাপাঠে অংশ নেওয়ার রেওয়াজ তেমন একটা নেই। ব্যক্তিগতভাবে যদিও অনেকেই ভোটের আগে-পরে তারাপীঠ, কালীঘাটে গিয়ে থাকেন। স্বভাবতই দলের নেতা হিসাবে অভিষেকের মন্দির সফরে বিজেপি নেতারা তৃণমূলের বিরুদ্ধে গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে টুকলিবাজির অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, ‘তৃণমূল এখন বিজেপিকে নকল করছে। মন্দিরে যাওয়ার পরম্পরা কার? বিজেপিকেই অনুসরণ করছে তৃণমূল।’
রাজনীতিতে অবিজেপি নেতা-নেত্রীদের মন্দির সফরকে নরম হিন্দুত্বের নিদর্শন হিসাবেই দেখা হয়। রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে তৃণমূল কি স্রেফ গোয়া আর ত্রিপুরা বিজয়ের লক্ষ্যেই নরম হিন্দুত্বের কৌশল নিয়েছে, নাকি ঘুঁটি সাজাচ্ছে ২০২৪-এর জন্য?
এই দুই রাজ্যের ভোটের সমীকরণে মুসলিম ভোট খুব একটা ফ্যাক্টর নয় নির্বাচনী পরিসংখ্যানেই তা স্পষ্ট। বরং, দুই রাজ্যেই হিন্দুদের পর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রভাব বেশি। লক্ষ্যনীয় হল, অভিষেক-সহ তৃণমূল নেতারা ত্রিপুরায় মন্দির সফর করলেও হালে ওই রাজ্যের একাংশে মুসলিমদের উপর হিন্দুত্ববাদীদের হামলার অভিযোগ নিয়ে বাংলার শাসক দল সেখানে সরব নয়। যদিও ওই ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন হস্তক্ষেপ করেছে। তৃণমূলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, হতে পারে, ওই রাজ্যের ভোট-অঙ্ক মাথায় রেখে মন্দির, গির্জায় যাওয়ার কৌশলই আপাতত নেওয়া হয়েছে।
তবে তৃণমূলের অন্দরের বড় অংশের মতে, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে দল খানিক ভাবমূর্তি বদলের চেষ্টা শুরু করেছে। ঘটনাচক্রে তার পিছনে আছে বাংলার বিধানসভায় তৃতীয় বারের জন্য অপ্রত্যাশিত সাফল্য।
২০২১-এ বাংলা থেকে তৃণমূল বিদায় নেবে, তা যেমন বিজেপির প্রত্যাশা ছিল, তেমনই তৃণমূলের অন্দরে অনেকের আশঙ্কা ছিল। কিন্তু দুই সম্ভাবনায় জল ঢেলে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয়বারের জন্য বাংলার কুর্শি দখলে রেখেছেন। বিভিন্ন নির্বাচনী বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, তৃণমূলের এই অভাবনীয় সাফল্যের পিছনে আছে বিজেপিকে ঠেকাতে মুসলিমদের জোটবদ্ধ হয়ে জোড়াফুলকে আঁকড়ে ধরার সিদ্ধান্ত। একইভাবে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষও তৃণমূলের পক্ষে দাঁড়ায়।
বিধানসভা ভোটের পরই কালীঘাট থেকে ভারত বিজয়ের ডাক দেওয়া হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তিনি গোটা দেশে যাবেন। তাঁর দল ঘোষণা করেছে, তৃণমূল নেত্রীকেই তারা দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে চায়।
তৃণমূলের এক নেতা বলেন, এই ঘোষণার পরই রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি-সহ হিন্দুত্ববাদী শিবির তৃণমূলকে মুসলমানদের পার্টি বলে ফের চাপা প্রচার শুরু করেছে। জোড়াফুলের প্রবীণ নেতারা বলছেন, বিজেপির প্রচারকে মিথ্যা প্রমাণ করতে মন্দির, গির্জা সফর রাজনীতিরই অঙ্গ। তবে সরকারিভাবে কোনও নেতাই দলের দুই শীর্ষ নেতার মন্দির সফর নিয়ে মুখ খুলতে চাননি। কিন্তু নরম হিন্দুত্বের পরিণাম কী হতে পারে তা নিয়ে দলের প্রবীণ নেতাদের সিংহভাহই সন্দিহান। তাঁদের বক্তব্য, রাহুল গান্ধী তো ওই পথে হেঁটেই ডুবেছেন। নিজের রাজনীতিটাই হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে কংগ্রেসের।