সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়
শোভন চক্রবর্তী
রবিবার সন্ধেবেলা একাধিক বুলেটে তাঁর শরীর ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল দুষ্কৃতীরা। রাতে বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে মৃত বলে ঘোষণা করা হয় ব্যারাকপুরের ডাকসাইটে বিজেপি নেতা মণীশ শুক্লকে। তারপর থেকেই উত্তাল টিটাগড়, ব্যারাকপুর-সহ সংলগ্ন এলাকা।
কিন্তু কে এই মণীশ শুক্ল? রাজনীতিতে তাঁর উত্থানই বা কোন পথে?

ঝকঝকে চেহারার মণীশ কিশোর বয়স থেকেই আগ্রাসী বলে পরিচিত ছিলেন এলাকায়। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে রাজনৈতিক কিংবা পাড়া বনাম পাড়া সংঘর্ষ নতুন ঘটনা নয়। একটা সময়ে এইরকম একাধিক সংঘর্ষের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে থাকেন মণীশ। জানা গিয়েছে, ২০০০ সাল নাগাদ টিটাগড় বাজারের একটি সংঘর্ষে প্রথম শিরোনামে আসেন তিনি। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অনেকের মতে, দু'হাত সমান চলা মণীশ.ক্রমশ তৎকালীন শাসকদল সিপিএম তথা ব্যারাকপুরের সাংসদ তড়িৎবরণ তোপদারের কাছের লোক হয়ে ওঠেন।
কিন্তু সিপিএমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অচিরে নিজের বাহিনী তৈরি করে ফেলেন তিনি। ততদিনে নিজে আইন পাশ করে গিয়েছেন। এরপর সিপিএম ছেড়ে কংগ্রেসে যান অল্প কিছু দিনের জন্য। তারপর তৃণমূল।
দেড় দশকের বেশি সময়ে তৃণমূলের নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন মণীশ। এই সময়েই তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠতে শুরু করে। বলা হতো, টিটাগড় থেকে চিড়িয়ামোড়-- এই জনপদের অলিখিত সম্রাট ছিলেন তিনি। নিজেকে সমাজসেবী পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। ক্লাবে অ্যাম্বুলেন্স দান, কয়েক হাজার লোকের রক্তদান শিবিরের মতো তাক লাগিয়ে দেওয়া কর্মসূচি করতেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে।

তৃণমূলে থাকার সময়েই অর্জুন সিংয়ের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন মণীশ। অর্জুনও তাঁকে ভাই বলে সম্বোধন করতেন। অনেকের মতে, গোবলয়ে যেমন 'ভাইয়া' সংস্কৃতি দেখা যায় ঠিক সেই ধাঁচেই নিজের কার্যধারা চালাতেন মণীশ।
কেউ কেউ বলত, উত্তর ২৪ পরগনা তথা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের একাধিক অটো রুটের অলিখিত আরটিও ছিলেন এই দাপুটে নেতা। তিনি অনুমতি দিলে তবেই মিলত রুট পারমিট। তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, খুন, ডাকাতির অভিযোগও কম নেই পুলিশের খাতায়। একাধিক অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধেও।
'গুরু' অর্জুন বিজেপির সাংসদ হওয়ার পর গত বছর জুন মাসে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন মণীশ। অনেকে বলেন, মণীশ বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর যে উৎসব টিটাগড়ে হয়েছিল তাতে প্রায় কোটি টাকা উড়ে গিয়েছিল এক রাতে। আতসবাজি, বিরিয়ানি-মাংস, ব্যান্ড পার্টি-- সে এক হইহই কাণ্ড!

এ হেন মণীশের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক চাপানউতর তুঙ্গে উঠেছে ব্যারাকপুরে। বিজেপির বক্তব্য, তৃণমূল মেরেছে। তৃণমূলের বক্তব্য, বিজেপির গোষ্ঠী কোন্দল। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে বলছেন, মণীশ তৃণমূলে থাকার সময়ে বিজেপি-সহ বিরোধীরা বলত, তিনি সমাজবাবিরোধীদের পাণ্ডা। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তৃণমূল বলত, মণীশ অ্যান্টিসোশ্যাল এলিমেন্ট! পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, মণীশ কি ছিলেন তা সবাই জানত! রাজনৈতিক দলগুলি শুধু তাঁকে ব্যবহার করে গিয়েছে।