শাশ্বতী সান্যাল
যৌথ পরিবার ভেঙে গেছে কবেই। কিন্তু বাবা মা সন্তানের নিউক্লিয়ার জগতও কি দিতে পেরেছে পারস্পরিক নৈকট্যের উত্তাপ? ভয়ের যে যথেষ্ট কারণ আছে, সে কথা কিন্তু মেনে নিচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। মা-বাবা বা পরিবারের বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে ক্রমশই দূরত্ব বেড়ে চলেছে তরুণ প্রজন্মের। ছোটো ছোটো নিউক্লিয়ার পরিবারের মধ্যেও বাঁধন দুর্বল হচ্ছে, কমছে সম্পর্কের উত্তাপ। ফ্যাশন ফিয়েস্তা শর্বরী দত্তের মৃত্যু আবার নতুন করে সেই সমস্যার দিকেই আঙুল তুলে দিল।
লকডাউনে ঘরবন্দি মানেই কিন্তু ফ্যামিলির সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় বা ইন্টারনেটেই দিনের অনেকখানি কাটাতে পছন্দ করেন এখন তরুণদের একটা বড় অংশ। অনলাইন আড্ডা, ভিডিও চ্যাটের মধ্যে দিয়ে ভার্চুয়াল বিশ্বে নিজেকে যত সংযুক্ত করছে মানুষ, ততই কি সরে যাচ্ছে নিজের পরিবার প্রিয়জনদের কাছ থেকে? ফ্যাশন জগতের অতিপরিচিত মুখ শর্বরী দত্তের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় আবার বড় হয়ে উঠে এল এই প্রশ্নগুলো।
১৭ তারিখ বৃহস্পতিবার, মহালয়ার দিন গভীর রাতে ব্রডস্ট্রিটের বাড়ির একতলার বাথরুম থেকে উদ্ধার হয় ফ্যাশন ডিজাইনার শর্বরী দত্তের দেহ। শুক্রবার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বেরোলে জানা যায়, আগের দিন রাতে নয়, বরং দুপুরের দিকে মৃত্যু হয়েছিল শর্বরী দত্তের। ১৭ তারিখ দুপুরে সেরিব্রাল অ্যাটাক হওয়ায় বাথরুমেই পড়ে যান তিনি। মাথায় আঘাত লাগে। ইন্টারনাল হ্যামারেজ বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই যে এই বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনারের মৃত্যুর জন্য দায়ী, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।
অথচ বৃহস্পতিবার বাড়িতে একা ছিলেন না শর্বরীদেবী৷ তাঁর ব্রডস্টিটের বাড়ির দোতলায় তাঁরই সঙ্গে বাস করেন শর্বরীদেবীর পুত্র এবং পুত্রবধূ৷ তারপরেও কেন সবার অজান্তে দীর্ঘক্ষণ বাথরুমে পড়ে থাকল এই বিখ্যাত ডিজাইনারের দেহ? পরিবারের একজনের দীর্ঘ অনুপস্থিতি কেনই বা টের পেলেন না বাড়ির বাকি সদস্যেরা? কেন চিকিৎসার ন্যূনতম সুবিধেও দেওয়া গেল না এই পেজ থ্রি ব্যক্তিত্বকে? তাহলে কি অমানবিকতার অসুখ কলকাতার ফুটপাত ছেড়ে ঢুকে গেছে উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তদের অন্দরমহলেও? এমনই নানা প্রশ্ন তুলে দিল শর্বরী দত্তের মৃত্যু।
এ ব্যাপারে মনোবিদ অনুত্তমা ব্যানার্জিকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,শর্বরীদির মৃত্যু দুঃখজনক, সন্দেহ নেই। তবে সম্পর্কের এই শিথিলতার ছবি অনেক পরিবারেই দেখা যায়। তাঁর মতে, "সম্পর্কে শৈত্য নানাকারণে আসতে পারে। তার জন্য সবসময় তরুণদের দায়ী করা ঠিক নয়। পারস্পরিক মান অভিমানের উর্ধ্বে উঠে তারপরও পরিবারের বয়স্ক মানুষদের শারীরিক সুস্থতা বিষয়ে কিছুটা বাড়তি সতর্কতা এবং দায়িত্ববোধের প্রয়োজন আছে বই কি!" তবে দূরত্ব এবং শৈত্যের দরুণ অনেকসময় পরিবারের মধ্যে অনিচ্ছাকৃত কিছু সমস্যা চলে আসে বলেও মনে করছেন এই বিশিষ্ট মনোবিদ। ইচ্ছাকৃত অবহেলা হয়তো নয়। তবে কি নেহাত মনোযোগের অভাবই কেড়ে নিলো এই বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনারের জীবন?
দীর্ঘদিনের পরিচিত হাসিখুশি শর্বরীদি আর নেই, একথা এখনও মেনে নিতে পারেননি ঊর্মিমালা বসু। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এই বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী বলেন "তাহলে আর বৃদ্ধাশ্রমকে দোষ দেওয়া কেন? যখন পরিবারের মধ্যে থেকেও মানুষকে লোকচক্ষুর আড়ালে একলা অসহায়ভাবে চলে যেতে হয়।" ঊর্মিমালা দেবীর কথায়, "পাবলিক ফিগাররা অনেকেই অবশ্য একটু প্রাইভেট পার্সন হন। নিজের মতো একা থাকতে ভালোবাসেন। আর শর্বরীদির সঙ্গে তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূর মনোমালিন্য তো এখন ঘোষিত সত্য। তবু বলব আজকের দিনে এই পরিণতিই যেন অনেকখানি স্বাভাবিক। পরিবারের মধ্যে থেকেও সবার অগোচরে এই চলে যাওয়া আজকের সমাজের সত্য। তাই শর্বরীদির না থাকা কষ্ট দেবে, কিন্তু তাঁর পরিণতি খুব বিস্ময়ের নয়, বরং আজকের সময়ে স্বাভাবিক।"