দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য রাজ্যবাসীর কাছে দলের ক্ষমা চাওয়া (apologize) উচিত বলে মনে করেন বিজেপির সদ্য প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। ‘দ্য ওয়াল’-কে এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি।
২ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিনই দলের ভুল স্ট্র্যাটেজিকে দায়ী করেছিলেন তিনি। ‘দ্য ওয়াল’-কেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভোটের মুখে তৃণমূল থেকে দলে দলে নেতা-কর্মীদের বিজেপিতে নেওয়া ঠিক হয়নি। বাছবিচার করা উচিত ছিল। নির্বিচারে নেওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁর যে সায় ছিল না, সে কথাও বলেছেন।
তাঁর কথায়, 'আমাদের দোষ লোকের কাছে বলতে সঙ্কোচ করা উচিত নয়। আমরা লোকের কাছে দায়বদ্ধ। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে আমাদের ভোট দিয়েছে। তাঁরা চাইছিল বিজেপি ক্ষমতায় আসুক। আসতে পারিনি আমরা। সেটা আমাদের দোষ। সেটা স্বীকার করা উচিত। যাতে লোকের বিশ্বাসটা আমাদের প্রতি থাকে।’
দিলীপ আরও বলেন, ‘বড় নেতারা তাঁদের ভাবমূর্তি বাঁচানোর চেষ্টা করবেন। দোষ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন। আমার কোনও দায় নেই। আমার ভাবমূর্তি বাঁচানোর কোনও ব্যাপার নেই। তাই দোষ অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। তাই আমি বলেছি। তাতে দলের লোকের খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু আমি মানুষের সঙ্গে কেন দু'নম্বরি করব?’
এর পরই তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের উচিত মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। বিজেপি ক্ষমতায় আসবে এই আশায় মানুষ ভোট দিয়েছেন আমাদের। আমরা পারিনি। আমাদের যোগ্যতার অভাব ছিল। আর সভাপতি হিসেবে এই ক্ষমা চাওয়ার দায় আমি নিয়েছি।’
ময়দানে যে দলের নেতা তাঁকেই দায় নিতে হবে বলে মত দিলীপবাবুর। তিনি বলেন, ‘কে ভুল করেছে, কে পরিকল্পনা করেছে সেকথা ভেবে লাভ নেই। তাই যেখানে গণ্ডগোল হয়েছে সেখানে আমি গিয়েছি। আমার মনে হয়েছে নেতা হিসেবে আমার দায় নেওয়া উচিৎ। তাই আমার লক্ষ লক্ষ কর্মী বেরিয়েছে, বুথে বুথে গেছে। সংবাদমাধ্যমে বা মঞ্চে ভাষণ সবাই দিতে পারেন, কিন্তু লড়াই ময়দানেই করতে হয়। নতুন কিছু করতে সামনে দাঁড়াতে হবে। আমার মনে হয়েছে আমি করেছি।’
নির্বাচনের আগে মোদী-শাহ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আনাগোনা ছিল বাংলায়। যার জন্য 'ডেলি প্যাসেঞ্জারি' বলে কটাক্ষ করতেও ছাড়েনি তৃণমূল। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পাঁচ মাস পরেও মোদী-শাহের মুখ থেকে বাংলার রাজনীতি সম্পর্কে একটি কথাও শোনা যায়নি। যেখানে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে তৎপর বঙ্গ বিজেপি। এই প্রসঙ্গে দিলীপবাবু বলেন, ‘মোদী-শাহের সাহায্য আমরা কাজে লাগাতে পারিনি।’
তাঁর কথায়, ‘দেশের যেখানেই নির্বাচন হয় সেখানেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা মোদী-শাহ যান সাহায্য করতে। আমাদের এখানেও সেই সাহায্য করতে এসেছিলেন বারবার। কিন্তু আমরা সেই সাহায্য কাজে লাগাতে পারিনি।’ কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে বিজেপির তরফে বহু নেতাই বাংলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই পর্যালোচনার কথা জানা যাবে বলে জানান দিলীপবাবু।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভুল স্বীকার করার প্রসঙ্গে দিলীপবাবুর জবাব, ‘সবাইকে সবসময় সব জায়গায় ভুল স্বীকার করতে হবে তার মানে নেই। আমরা কী করতে আছি। নির্বাচনের পর আমার কাছ থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জানতে চেয়েছিল কী ভুল হয়েছে। আমি জানিয়েছি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তাদের।’
ভুল কী কী ছিল? দিলীপবাবুর কথায়, ‘যাঁদের সঙ্গে আমাদের দলের ভাবমূর্তি বা নীতি মেলে না, সমাজ যাকে ভালো চোখে দেখছে না তাঁদের নেওয়া উচিৎ হয়নি। তারজন্যই দলের মধ্যেই বিরোধিতা হয়েছিল। তখন নিয়েছি আমরা, কিন্তু তাঁরা জিততেও পারেনি। ঠিক থাকলে নিশ্চয় জিতত। বিজেপির ভোট বেড়েছে কিন্তু জিততে পারেনি ওরা। এখন আবার চলেও যাচ্ছে। তখন মনে হয়েছিল নেওয়া ঠিক হবে। কিন্তু ঠিক হয়নি।’
তবে এখনও দলের অন্দরে অনেকেই আছে যাঁরা দলবদল করার কথা ভাবছেন। সেই প্রসঙ্গে দিলীপবাবু বলেন, ‘গণতন্ত্রে সব দলের এমন লোক থাকে। ক্ষমতায় থাকলে লোক থাকে। বাবুল সুপ্রিয় মন্ত্রী ছিলেন। ক্ষমতায় ছিলেন। এখন চলে গেছেন। পদ হারানো থেকে জেলে যাওয়ার মতো ভয়, এমন অনেক ব্যাপার থাকে। এদের যখন যেখানে নিরাপদ মনে হয় তখন সেখানে যায়। দু-একজন লোক এল কী গেল তাতে দলের পরিবর্তন হয় না। একসময় হাজার হাজার লোক বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তৃণমূল তো শেষ হয়নি।’
মুকুল রায়ের মতো মানুষের ওপর দলের ভরসা করা ঠিক হয়নি, স্পষ্ট জবাব দিলীপ ঘোষের। তিনি বলেন, ‘এখন তিনি কোথায় আছেন?’ মুকুল রায়কে দলে নেওয়ার ব্যাপারে যে দিলীপ ঘোষের মত ছিল না সেকথা এদিন আবারও বুঝিয়ে দিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘অনেক সময় সায় না থাকলেও অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। তাতে অনেক সময় লাভ হয় যেমন, অনেক সময় ক্ষতিও হয়।’