
শেষ আপডেট: 16 March 2022 10:52
পূর্ব ইউরোপজুড়ে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ইউক্রেন আক্রমণ করেছে রাশিয়া। ভয়ানক সেই যুদ্ধের আঁচ বাঁচিয়ে বাংলায় ফিরতে পেরেছেন যে সমস্ত পড়ুয়া তাঁদের নিয়েই বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Ukraine Students in Bengal)। ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রের সেই বৈঠকে ইউক্রেনে পড়তে যাওয়া বাংলার ছাত্রছাত্রীদের এ রাজ্যেই কোর্স শেষ করার বন্দোবস্ত করে দেওয়া হবে, আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী (Mamata Banerjee)।

ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল সমস্যা বেশ গভীর। ইউক্রেন ফেরত পড়ুয়ারা বলছেন, এ রাজ্যে পড়ার সুযোগ পেলে তো ঘর ছেড়ে বিদেশে যেতেন না কেউই! কিন্তু এখানে সুযোগটাই যে নেই!
গোপীবল্লভপুরের প্রণব বারিক ইউক্রেনে এমবিবিএস কোর্স করতে গিয়েছিলেন। ৬ বছরের কোর্স মাঝপথেই ফেলে আসতে হয়েছে। তিনি জানান, এখানে প্রাইভেটে ডাক্তারি পড়তে চাইলে অনেক টাকা খরচ। সেই তুলনায় ইউক্রেনে ডাক্তারি পড়ার খরচ অনেক কম। এ রাজ্যে যেখানে এক কোটি টাকার কাছাকাছি খরচ হয়, সেটা ওদেশে অর্ধেকেরও কম টাকায় হয়ে যায়। সেই কারণেই নিজের দেশ ছেড়ে ভিনদেশে পড়তে যাওয়া।

বাংলার সরকারি কলেজগুলোতে মেডিকেল পড়ার সুযোগ সকলের হয় না। কারণ এখানে আসন সংখ্যা অনেক কম। আর বেসরকারি কলেজে মেডিকেল পড়া মানেই কোটি টাকার কাছাকাছি খরচ। সব দেখেশুনেই মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েদের ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পাড়ি দিতে হয়েছে ইউক্রেনে।
ইউক্রেন ফেরত পড়ুয়াদের হাতে হাতে মমতার ‘কবিতাবিতান’! উপহারের ঝুলিতে আর কী ছিল
আসানসোলেন অনিকেত সাঁউ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ছোট থেকেই। কিন্তু এদেশে কম্পিটিশন অনেক বেশি। চেষ্টা করেও সুযোগ পাননি। বাড়ির লোকের সঙ্গে আলোচনা করে তাই শেষমেশ ইউক্রেনে যাওয়াই স্থির হয়। ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার মধ্যেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নপূরণের হাতছানি রয়েছে সেই দেশে। বাংলায় তা নেই।

আলিপুরদুয়ার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে এসেছিলেন মেডিকেলের চতুর্থ ও দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া শিখা সিং, অঞ্জলি ছেত্রী। তাঁরা জানান তাঁরা জেনারেল ক্যাটেগরির ছাত্রী। তাই এ রাজ্যে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাননি একেবারেই। জেনারেল ক্যাটেগরির জন্য আসন সংখ্যা এখানে খুবই সীমিত। তাছাড়া এখানে বেসরকারি কলেজে যে কোর্স করতে এক থেকে দেড় কোটি টাকা লাগছে, সেই একই কোর্স ইউক্রেনে করা যায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকাতেই। সেই কারণেই ইউক্রেনকে কেরিয়ার গড়ার জন্য বেছে নিয়েছেন তিনি।

তৃতীয় বর্ষের ছাত্র প্রবীণ কুমার জানালেন, ইউক্রেনে ডাক্তারি পড়ার খরচ অনেক কম তো বটেই, সেই সঙ্গে যেভাবে যত্ন সহকারে ওখানে পড়ানো হয়, এখানে তার সুযোগ নেই। কারণ সেখানে এক-একটা ক্লাসে মাত্র ১০ থেকে ১২ জন পড়ুয়া নিয়ে ক্লাস চলে। প্রতি ছাত্রছাত্রীর উপর শিক্ষক আলাদা করে নজর দিতে পারেন, শেখায় কোনও ফাঁকি থাকে না। কিন্তু এখানকার কোনও কলেজেই এত কম ছাত্রছাত্রী নিয়ে ক্লাস চলে না।

ইউক্রেনে পড়ানোর মান, প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকে চোখ রেখে অনেক পড়ুয়া আবার এদেশে সুযোগ পেয়েও সেখানেই গেছেন ডাক্তারি পড়তে। কলকাতার ইশান কাপুর বললেন, চেন্নাইতে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বন্ধুরা সেখানে গেলেও তিনি ইউক্রেন চলে যান। কারণ ওখানে পড়ার খরচ কম, পড়ানো হয়ও যত্ন নিয়ে।

যুদ্ধের ইউক্রেন ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে সকলকে। কেরিয়ারে উঠেছে বড়সড় একটা প্রশ্নচিহ্ন। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে কী হবে ভেবেই পাচ্ছিলেন না কেউ। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে স্বস্তি পেয়েছেন ইউক্রেন ফেরত শিখা, প্রবীণ, দিব্যমরা। এ রাজ্যেই বাকি কোর্স শেষ করার আশ্বাস পেয়ে সকলেই খুশি। ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে এদিন ছিল ইউক্রেন ফেরত এক ঝাঁক হাসিমুখ। মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসবাণীতে ভর করে যাঁরা স্বপ্নপূরণের জন্য ডানা মেলছেন নতুন করে।