দ্য ওয়াল ব্যুরো: ষোলো সালের ভোটে একাই দু’শো পেরোলেও খড়্গপুর সদর ও কালিয়াগঞ্জের দখল নিতে পারেননি দিদি। তৃণমূলের প্রবল প্রতাপের সময়েও তা অধরা ছিল। বরং লোকসভা ভোটে সেখানে পরাজয়ের ব্যবধান বেড়েছিল বিস্তর। আর আজ, লোকসভা ভোটে হারের পর মনোবল তলানিতে তৃণমূলের, সেই নেতিবাচক পরিস্থিতিতেই রেকর্ড গড়ল শাসক দল। খড়্গপুর সদর ও কালিয়াগঞ্জ—এই দুই আসনই বিজেপির থেকে ছিনিয়ে আনলেন তৃণমূলের তরুণ নেতা তথা পরিবহণ ও সেচমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে নতুন রেকর্ডও স্থাপন হল। ১৯৭২ সালের পর থেকে কোনও শাসক দলের বিধায়ক জেতেননি খড়্গপুর থেকে। এবার তাই করে দেখালেন শুভেন্দু। তৃণমূলের নেতারাই বলছেন, উপনির্বাচন ফাইনাল ম্যাচ নয় ঠিকই। কিন্তু এই টুর্নামেন্টে ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ তিনিই।
অথচ লড়াইটা কোনও ভাবেই সহজ ছিল না এই দুই আসনে। বরং চ্যালেঞ্জ ছিল পাহাড়প্রমাণ। কালিয়াগঞ্জে লোকসভা ভোটে ৫৬ হাজারেরও বেশি ব্যবধানে জিতেছিল বিজেপি। খড়্গপুরে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল ৪৫ হাজার। সেই ব্যবধান মুছে কালিয়াগঞ্জে তৃণমূল প্রার্থী তপনদেব সিংহ জিতেছেন ২৩০৪ ভোট। খড়্গপুরে শাসক দলের প্রার্থী প্রদীপ সরকারের জয়ের ব্যবধান হয়েছে ।
খড়্গপুর সদরে যেদিন তৃণমূল প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিচ্ছেন, সেদিন বিরাট মিছিল শেষে শুভেন্দু বলেছিলেন, “এই কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের বিধায়ক ছিলেন জ্ঞানসিং সোহনপাল। যাঁকে সবাই চাচা বলেই চিনতেন। তিনি আমার বাবা শিশির অধিকারীর গুরু। আমি জানি প্রয়াত চাচার আশীর্বাদ তাঁর শিষ্যের ছেলের সঙ্গেই থাকবে।” আট বারের বিধায়ক ছিলেন চাচা। ২০১৬ সালে তাঁকে হারিয়েই বিধানসভায় গিয়েছিলেন দিলীপ ঘোষ। তিনি সাংসদ হওয়ার ফলেই এই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। অনেকের মতে, খড়্গপুর যতটা না তৃণমূল-বিজেপির লড়াই ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল দিলীপ ঘোষের সম্মানের লড়াই। ভোটের দিন কোনও রকম অশান্তি ছাড়াই সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যে সেখানে জিতল তৃণমূল।
শুভেন্দু এদিন বলেন, “খড়্গপুরের লড়াই ছিল দিলীপ ঘোষ আর প্রদীপ সরকারের। সেই লড়াইয়ে দিলীপবাবু হেরেছেন।” তাঁর কথায়, “আগেই বলেছিলাম, দিলীপ ঘোষ বয়সে বড় হতে পারেন, কিন্তু রাজনীতিতে উনি আমার তুলনায় নবীন”।
লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই দলে গুরুত্ব বাড়তে শুরু করেছিল শুভেন্দুর। জঙ্গলমহলে খারাপ ফলের পর সেখান থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত বক্সীদের সরিয়ে জঙ্গলমহলের দায়িত্ব একা শুভেন্দুর কাঁধে তুলে দিয়েছিলেন মমতা। এসবের পরে দেখা যায় ভাইফোঁটার দিন এই প্রথম শুভেন্দুর কপালে ফোঁটা দেন দিদি।
অনেকের মতে, তৃণমূলে কার কতটা গুরুত্ব তা বোঝা যায় ভাইফোঁটায় দিদির কাছে কারা ফোঁটা পাচ্ছেন সেটা দেখে। এদিনের জয়ের পর সকাল থেকেই একের পর এক অভিনন্দনের ফোন পেয়েছেন তৃণমূলের তরুণ এই নেতাটি। আর রাজনৈতিক মহলের অনেকেই বলছেন, খড়্গপুর আর কালিয়াগঞ্জ জিতিয়ে শুভেন্দুই এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে শাসক দলে দু’নম্বরে। দলের অনেককেই মাইল খানেক পিছনে ফেলে দিলেন তিনি।
লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবির মধ্যেও বরাবরের অধরা দু'টি আসন মুর্শিদাবাদ ও জঙ্গিপুরে জিতেছিল তৃণমূল। ওই জেলার পর্যবেক্ষক ছিলেন শুভেন্দু। খড়্গপুর জয় সম্পর্কে তিনি এদিন বলেন, “জুন মাস থেকে টার্গেট করেছিলাম। ৫৪ জন পর্যবেক্ষক বসিয়েছিলাম। প্রার্থী পাঁচ মাস ধরে ঘুরে ঘুরে কাজ করেছেন। দিলীপ ঘোষ ব্যক্তি আক্রমণ করেছিলেন আমার বিরুদ্ধে। আর মুকুল রায় বলেছিলেন, শুভেন্দু যেখানে যান, সেখানেই হারেন। আজ হাতেনাতে ফল পেয়ে গিয়েছে বিজেপি।”

তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা অনেকেই বলেন, শুভেন্দু যদি জেদ ধরেন কিছু করবেন, তাহলে সেটা করেই ছাড়েন। সে নন্দীগ্রাম থেকে সিপিএমের বাহিনীকে হঠানো হোক বা জঙ্গলমহলকে শান্ত করার নেতৃত্ব দেওয়া—শুভেন্দু করে দেখিয়েছেন। এদিন মন্ত্রী বলেন, “আমি যখন নন্দীগ্রামে গিয়েছিলাম, সেদিন আমাদের এজেন্ট বসতে পারত না। জঙ্গলমহলে তৃণমূলকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল সিপিএম। আর মুর্শিদাবাদে আমাদের দল ছিল তৃতীয় স্থানে।”
তিনি যেন বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, মাজা ভেঙে যাওয়া অবস্থা থেকে দলকে কোথায় তুলে নিয়ে গিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে শুভেন্দু বলেন, “নেত্রীকে ধন্যবাদ। মাটির মানুষদের প্রার্থী করেছিলেন তিনি। মানুষ আমাদের সমর্থন করেছেন। আমি নয় আমরা, এতেই মানুষের বিশ্বাস অর্জন সম্ভব।”