দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিষ্যুদবার রাতেই সরগরম ছিল মধ্য হাওড়া। কেন? কারণ, দলের সদ্য প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা সমবায় মন্ত্রী অরূপ রায়ের সঙ্গে হঠাৎ বৈঠক করতে গিয়েছিলেন পেশাদার ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোর। তা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে যখন নানান জল্পনা, সন্দেহ, কৌতূহল, তখন আবার টিপ্পনিও উড়ে এসেছে বিরোধী শিবির থেকে। তবে সে টুকুতেই থেমে ছিল।
কিন্তু শুক্রবার সকাল হতে সম্ভবত এ সব ব্যাপারেই বিদ্রোহ-বিক্ষোভের স্বর উঠে এলো তৃণমূলের মধ্যে থেকেই। কোচবিহার দক্ষিণের তৃণমূল বিধায়ক মিহির গোস্বামী এদিন সকালে ফেসবুকে পোস্ট লিখেছেন। তাতে মিহিরবাবুর বক্তব্য, “আজ যখন দেখছি দিদির দলে কোনও ঠিকাদার থিঙ্কট্যাঙ্ক কোম্পানি ঢুকে পড়ে তছনছ করে দিচ্ছে ঘরবাড়ি, অপমানিত জনপ্রতিনিধিরা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, অথচ দিদি অন্তরালে নির্বিকার, তা হলে সেই ঘরবাড়ির মতোই দিদির প্রতি এত দিনের সব আস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়?”
সম্ভবত মিহিরবাবু প্রশান্ত কিশোরের পেশাদার সংস্থা আই-প্যাকের কথাই বোঝাতে চেয়েছেন। বস্তুত প্রশান্ত কিশোর বা আই-প্যাক যেভাবে দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নির্ধারণে ভূমিকা পালন করছে তা নিয়ে শাসক দলের ভিতরে আড়ালে আবডালে ক্ষোভ অসন্তোষ কমবেশি আগেও ছিল। এক সময়ে অনেকে এও বলতে শুরু করেছিল যে পেশাদার সংস্থা যদি কোনও রাজনৈতিক দলের কৌশল নির্ধারণ করে তা হলে রাজনীতিকদের কী কাজ অবশিষ্ট রইল? এও তো এক প্রকার রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা।
সে যাক। ভিতরে ভিতরে যাই আহ্লাদ-অসন্তোষ থাকুক প্রকাশ্যে এ সব নিয়ে সমালোচনার সাহস দিদির দলে এর আগে কেউ দেখাননি। মিহিরবাবু দেখালেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে মোদ্দা দুটি বিষয় উঠে আসছে। এক, ‘ঠিকাদার’ সংস্থার বিরুদ্ধে উষ্মা। দুই, সর্বোচ্চ নেতৃত্বে প্রতি আস্থায় ঘাটতি।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, এ সব বিষয় খুব ছোঁয়াচে। দ্রুত ছড়ায়। একজন কেউ বলতে শুরু করলে তা অন্যদেরও সাহস জোগায়। তাই এ সব ভাল লক্ষণ নয়। কোনও রাজনৈতিক দলের মধ্যে সবাইকে খুশি করে চলা সম্ভব নয়। অনেকেই অখুশি থেকে যান। অনেকে মনে করেন তিনি প্রাপ্যের তুলনায় কম পেয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা তাঁদের মনে নতুন করে অসন্তোষ খুঁচিয়ে তুলতে পারে।
বিষ্যুদবার নবান্নে প্রশাসনিক বৈঠক চলাকালীন দুর্গাপুরের মেয়রের উদ্দেশে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরক্ষণেই বলেন, এখন তো আবার কাউকে কিছু বলা যাবে না। বললেই অন্য দলে চলে যাওয়ার নতুন ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে।
অনেকের মতে, এর অর্থ হল এমন কোনও ট্রেন্ড শুরু হয়েছে বা হতে পারে বলে ধারনা রয়েছে দিদির। ইতিমধ্যে দলের এক মজবুত নেতা অরাজনৈতিক মঞ্চ থেকে কড়া বার্তা দিতে শুরু করেছেন। তাঁকে শাসক দল তথা গোটা বাংলার রাজনীতিতেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সঙ্গত দিতে নেমে পড়েছেন মিহির গোস্বামীরা। প্রসঙ্গত, কদিন আগেই কোচবিহারের বিজেপি সাংসদ নিশিথ প্রামাণিক মিহিরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। পরদিন আবার তৃণমূল নেতারা মিহিরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁর খোঁজ পাননি। এই ধরনের বিড়ম্বনা অস্বস্তিও তৈরি করছে।
বলে রাখা ভাল, রাজ্য রাজনীতিতে এমনিতেই আলোচনা রয়েছে যে একুশের ভোটের আগে শাসক দলের কিছু বিধায়ক নেতা বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন। সে ব্যাপারে বিজেপি নেতারা যেমন দাবি জানাচ্ছেন, তেমনই আবদুল মান্নানের মতো প্রবীণ কংগ্রেস নেতারাও প্রকাশ্যে সে কথা বলছেন। সেই সব আলোচনার আবহেই মিহির গোস্বামীদের বিদ্রোহের স্বর উঠে আসছে। এখন দেখার কোথাকার জল কত দূর পর্যন্ত গড়িয়ে যায়।