শোভন চক্রবর্তী
গত এক মাসে তিতলির খুব নামডাক হয়েছে। সবাই বলছে মাল্টিট্যালেন্টেড। এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে বাবা মায়ের সঙ্গে ছোটনাগপুর বেড়াতে যাচ্ছিল তিতলি। হঠাৎ ট্রেনের চালক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই ছোট্টবেলায় বাবার এনে দেওয়া কমিক্স বইয়ে এরকমই একটা ঘটনার কথা পড়েছিল। চকিতে সেটা মনে পড়ে গেল। অসুস্থ চালককে সরিয়ে নিজেই ট্রেন চালাতে শুরু করে তিতলি।
ভাবা যায়! তার পর যা হয়... মিডিয়া, ক্যামেরা, ইন্টারভিউ। কেউ বিপদে পড়লেই এখন তিতলির কাছে বুদ্ধি নিতে আসছে।
গত দুদিন ধরে সেই তিতলিরও মাথাটা বোঁ বোঁ করছে। যখন থেকে শুনেছে, জেলে থাকা একটা দুষ্টু লোক কাকে কাকে যেন চিঠি লিখে বলেছে, বিমানদা নাকি তার থেকে ২ কোটি টাকা নিয়েছে। মানে ২-এর পরে সাতটা শূন্য। তার পর থেকে তিতলির মাথায় যেন ভর করে বসেছে ফেলুদা, ব্যোমকেশ! শীতটা জমিয়ে পড়েনি। তবে সকালটায় ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আছে। দাদুর ইজি চেয়ারে একটা পাতলা শাল মুড়ি দিয়ে বসে খালি ভাবছে আর ভাবছে...। দুর্গা মাসি দুধ দিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে দুধের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে... আর মুখ গম্ভীর করে ভাবছে। বিমানদা অতগুলো টাকা নিয়ে কী করেছে?
কমরেড বিমানদা পার্টি করেন। সর্বহারাদের পার্টি। ভ্যানগার্ড অব প্রোলেতারিয়েত। উনি পার্টি অফিসেই থাকেন শুনেছে তিতলি। তা ছাড়া বয়সও আশি পেরিয়ে গেছে। কে যেন সেদিন বলছি, এখন অনেকটা সময় গাছ নিয়েই থাকেন। তা হলে কর্তার বুড়ো বয়সে বিলাসের ইচ্ছে হয়েছে। বাগানবাড়ি কিনেছেন।
ব্যাপারটা মাথায় আসতেই খটখট করে ফোন ঘুরিয়েছে তিতলি। তার পর জেনেছে। নাহ! বাগানবাড়ি-ফাড়ি কিছু না। পার্টি অফিসের ছাদেই কুড়ি-পঁচিশটা টব লাগিয়েছেন। মালি রাখেননি। নিজেই সার জল দেন।
তাহলে টাকাটা কী করলেন?
আরও গভীরে যেতে থাকে তিতলি। অনুপম রায়ের গানের মতো... গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও...। জানতে পারে, বিমানদা অনেক বড় বাড়ির ছেলে। ছাত্র বয়সেই ঘর ছেড়েছিলেন পার্টি করবেন বলে। তার পর থেকে ষাট বছর ধরে পার্টিই করে যাচ্ছেন। বিয়ে করেননি। মানে অকৃতদার। পার্টি অফিসেরই একটা ছোট ঘরে থাকেন। সিঙ্গল বেডে ঘুমোন।
এক সময়ে রাঢ় বাংলার জেলায় জেলায় ঘুরে সাক্ষরতা প্রসারের কাজ করতেন। সেই সময়ে থাকতেন আদিবাসী বাড়িতে। তাঁদের সঙ্গে পাত পেড়ে বসে নাকি আস্ত ইঁদুরও খেয়ে নিতেন। এমনই সাবলীল।
কিন্তু সে বললে হবে! ২ কোটি টাকা নিয়েছেন বলে কথা। আচ্ছা! ওঁর ঘরে তো অনেক বই রয়েছে শোনা যাচ্ছে। মানে বইয়ের স্তূপ! তাহলে কি ২ কোটি টাকার বই কিনেছেন বিমানদা। তিতলি ভাবতে থাকে... ২ কোটি টাকায় কত বই হতে পারে। অত বই দশ বাই বারো ঘরে রাখা যাবে কিনা। তার পরে জানতে পারে, ধুর! ওগুলো তো পুরনো বই। রবীন্দ্রনাথ, ম্যাক্সিম গোর্কি, পাবলো নেরুদা, ইরফান হাবিবের লেখা বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ঘরে।
তিতলি জানে বিমানদা একটু বদমেজাজি। অনেকে নাকি বলেন, বিমানদার মেজাজ চেরাপুঞ্জির মতো। এই রোদ তো এই বৃষ্টি। কখন কী বলে দেন! এক বার তো একজনকে রেগেমেগে বলে দিলেন "পালা এখান থেকে পালা!" তার পরে তিনি মানহানির মামলা ঠুকে দেওয়ায় কী বিপত্তি! বালতি হাতে চাঁদা তুলতে হয়েছিল আদালতের খরচ তোলার জন্য।
বেঁটে-খাটো পক্ককেশ ভদ্রলোক হঠাত্ হঠাত্ গলা খেঁকিয়ে কথা বলেন। তবে লোক ভাল। বাচ্চাদের খুব ভালবাসেন। আদর করে গাল টিপে দেন।
তিতলি ভেবে যাচ্ছে.... আচ্ছা বিমানদা দামি মোবাইল ফোন কিনেছেন নাকি! কীসব এখন দামি দামি ফোন বেরিয়েছে। ভাল ছবি ওঠে!
ফের ফোন ঘোরায় তিতলি। কিন্তু জানতে পারে, বিমানদা স্মার্টফোনের ব্যাপারে নাকি খুব আনস্মার্ট। আর সেলফি তোলা একদম পছন্দ করেন না। খুব রেগে যান। পারলে হাত চালিয়ে মোবাইলও ফেলে দেন। একবার তো একটা ছেলে তাঁর প্রায় গায়ের উপর উঠে সেলফি তুলতে গিয়ে কী বকাই না খেয়েছে! বেচারা!
তিতলি আর ভেবে কূল পাচ্ছে না। এরকম একটা লোক একমাত্র তা হলে জামা কাপড় কিনে, নেশাভাং করেই পয়সা লোটাতে পারে। খোঁজ নিয়ে দেখি তো!...
ফোনের ওপার থেকে রবিনদা বললেন, “বিমানদার পোশাকের কথা আর বলো না। ওই তো ধুতি পাঞ্জাবি পরেন। ঘরে ফতুয়া পাজামা। নিজের জামা কাপড় নিজেই কাচেন, নিজেই ইস্ত্রি করেন। এখনও। দুবেলা নামমাত্র খাওয়া দাওয়া। তবে হ্যাঁ মোচার ঘণ্টটা ভাল রান্না করতে পারেন। কীভাবে ঘি গরমমশলা দিয়ে তা বানাতে হয় সেই রেসিপিও শিখিয়ে দেন মুড হলে!” তিতলি এবারও হতাশ। রবিনদা কিন্তু বলে যাচ্ছেন। “ওঁর নেশা বলতে তো লিকার চা আর সিগারেট। তাও লম্বা ফিলটারের সিগারেট নয়। বরং বাঁকুড়ার ছাতনার বিড়ি বড্ড ভালবাসেন।”
এর পর আর একটাই অপশন ছিল তিতলির। মেলা, খেলা উৎসব করে বিমানদা টাকা উড়িয়েছেন কিনা! কিন্তু রবিনদা বলেছেন, ওই একজন মণীষীর নামে যে মেলা করেন! ধুর ও টাকা তো এমনিই উঠে যায়। সে জন্য কমিটিও রয়েছে তো।
বিমানদার ব্যাপারে তিতলি যত জেনেছে ততই যেন অবাক হয়েছে! এখন অন্য একটা প্রশ্ন এবার ওর মাথায় ঘুরঘুর করছে। আদৌ কি বিমানদা টাকাটা নিয়েছেন? তাও আবার ২ কোটি! বিমানদাকে ছেড়ে তিতলি এখন ওই দুষ্টু লোকের চিঠিটা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। আচ্ছা চিঠিটা সত্যি তো! ভুয়ো নয় তো! ওই দুষ্টু লোকটা নিজেই লিখেছে তো! ওঁরই হাতের লেখা? তদন্ত এজেন্সি বিসিআই যে বলছে... সাত বছর ধরে জেলে রয়েছে, আগে এসব নাকি বলেনি।
তিতলির মাথায় যেন জেদ চেপে বসছে, চিঠির রহস্য ফাঁস করতেই হবে।
(সব চরিত্র কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে এর কোনও মিল খুঁজে পেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয়।)
অঙ্কন: শুভ্রনীল ঘোষ