
শেষ আপডেট: 28 April 2023 11:35
মে মাস মানেই ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম নেওয়ার মাস। এপ্রিল-মে থেকেই সাগরে জট পাকাতে থাকে ঘূর্ণাবর্ত। গত কয়েক বছর ধরে ঘূর্ণিঝড়ের দাপট দেখেছে বাংলা। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ট্রপিক্যাল সাইক্লোনগুলি বরাবরই ভয়ঙ্কর হয়। কুড়ি সালের মে মাসে ‘ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোন’ বা অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় (Cyclone) আমফানের দাপট দেখেছিল পশ্চিমবঙ্গ। তছনছ হয়ে গিয়েছিল গাঙ্গেয় বঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকাগুলো। এরপরে ইয়াসের তাণ্ডবও ছিল সাঙ্ঘাতিক। আবারও ঘূর্ণিঝড়দের আস্ফালনের (Thunderstorm) সময় এসে গেছে। এবার এই খামখেয়ালি গরম-বৃষ্টি, ঘন ঘন পরিবর্তনশীল আবহাওয়ায় (Weather) কী হতে চলেছে তার পূর্বাভাস দিলেন প্রযুক্তি-পরিবেশবিদ সৌমেন্দ্র মোহন ঘোষ।

বাঙালির স্বপ্নের ঋতুরঙ্গে আজও ছয় ঋতুর খেলা। এ বঙ্গে ছয় ঋতুই আর নেই। বাংলায় আজ আবহাওয়ার সঙ্গে 'খামখেয়ালি' ট্যাগ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবেশবিদ সৌমেন্দ্রবাবু বলছেন, বাংলার আবহাওয়া কয়েক বছর আগেও এমন ছিল না। বাংলা কেন, সারা দেশ, বিশ্বের বিভিন্ন শহরের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বদলাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হল জলবায়ু বদল। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, সমুদ্রের জলের তাপমাত্রাও বেড়েছে, মেরু প্রদেশে বরফ গলছে, কাজেই এর ভয়ঙ্কর প্রভাব দেখা দিচ্ছে। সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা এত বেড়েছে যে অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় হল সমুদ্রে তৈরি প্রচণ্ড শক্তিশালী ঝড়। ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে এই ধরনের ঝড় তৈরি হয়। সাধারণত নিম্নচাপ থেকে জন্ম হয় ঘূর্ণিঝড়ের। নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যদি বেড়ে যায় তাহলে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। ফলে একটা শূন্য়স্থান তৈরি হয়। সেই খালি জায়গা ভরাট করতে তখন মেরু অঞ্চল থেকে ঠান্ডা বাতাস নিরক্ষরেখার দিকে ছুটে আসে। কিন্তু এই বাতাস সোজাসুজি প্রবাহিত হয় না। পৃথিবী তার নিজের অক্ষের চারদিকে ঘোরে বলে একরকম শক্তি তৈরি হয় (করিওলিস ফোর্স), যার ফলে এই বাতাস উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণে ও দক্ষিণ গোলার্ধের উত্তরে বেঁকে যায়। প্রবল বেগে বইতে থাকা এই বাতাস ঘূর্ণি তৈরি করে, যাকেই আমরা ঘূর্ণিঝড় বলি। এই ঘূর্ণিঝড় তৈরির জন্য সমুদ্রের তাপমাত্রা বিশেষ ভূমিকা নেয়। যদি সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয় তাহলে সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় তৈরির আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়।
ঘূর্ণিঝড়কে পাঁচ ক্যাটেগরিতে ভাগ করা হয়--ট্রপিক্যাল সাইক্লোন, সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম, ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম, এক্সট্রিমলি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম। গত বছর মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার উপকূলে যে অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়েছিল তার নাম ছিল আমফান, সেটি ছিল সুপার সাইক্লোন। পরিবেশবিদ বলছেন, গত কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে, বঙ্গোপাসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধির গড় হার অনেকটাই বেশি। গত এক দশকে বঙ্গোপসাগরে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দানা বেঁধেছে। তার জন্য সাগরজলের উষ্ণতাই দায়ী। গত তিন বছরে গ্রীষ্মে তিনটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে দেখা গিয়েছে। তার মধ্যে ২০২০ সালের আমফান এবং ২০২১ সালে ইয়াস দক্ষিণবঙ্গেই আছড়ে পড়েছিল।
তবে আরও একটা ফ্যাক্টর কাজ করে। ঘূর্ণিঝড় তৈরির পরে সে কোন দিকে বয়ে যাবে তার পিছনে কয়েকটি কারণ ক্রিয়াশীল থাকে। বায়ুমণ্ডলের উপরি স্তরের বায়ুপ্রবাহের গতি ও অভিমুখ তার অন্যতম। এপ্রিল-মে মাসে গাঙ্গেয় বঙ্গ-সহ পূর্ব উপকূলে যে-ধরনের বায়ুপ্রবাহ চলে, তাতে ঘূর্ণিঝড় বাংলায় বা কাছেপিঠে আছড়ে পড়তে দেখা যায়। বর্ষার পরে আবার ঠান্ডা, শুকনো বায়ুর প্রভাবে ঘূর্ণিঝড় দুর্বল হতেও দেখা গিয়েছে। তাই মনে করা হচ্ছে, এপ্রিল-মে মাসে কোনও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে সে বঙ্গে হানা দিতে পারে।
পরিবেশবিদ ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ সৌমেন্দ্রবাবু বলছেন, এবার বৃষ্টি হবে এমন খাপছাড়া। ছন্নছাড়া। একটানা মুষলধারে বৃষ্টি বা অতি বৃষ্টির সম্ভাবনা এবার কম। বরং শিলাবৃষ্টির (Hail Storm) সম্ভাবনা এবার বেশি। শিলাবৃষ্টি হওয়ার কারণই হল প্রচণ্ড গরম ও উত্তপ্ত হাওয়া। চৈত্রের শেষে বা বৈশাখের শুরুতে যখন তীব্র দাবদাহ হয়, তখন গরম উত্তপ্ত হাওয়া উপরে উঠে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করে। এই কারণেই কালবৈশাখী হয়। আর কালবৈশাখীর ঝড় ও বৃষ্টির সঙ্গেই শিল বা বরফের টুকরো পড়তে দেখা যায়, যাকে আমরা বলি শিলাবৃষ্টি। এই শিলা আসলে বরফের টুকরো যা বৃষ্টির কণা জমাট বেঁধে তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় মেঘের মধ্য়ে বৃষ্টি জমে থাকলে তা যখন ঠান্ডা হাওয়ার সংস্পর্শে আসে তখন জমাট বেঁধে বরফ তৈরি করে।

এই এই ছোট ছোট বরফ কণা আশপাশের আরও বরফখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং বড় শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। এই শিলাখণ্ড যখন বেশি ভারী হয়ে যায়, তখন তার ওজনকে আর বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে না। তখন এগুলো শিলাবৃষ্টি আকারে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। মাটিতে ঝরে পড়ার সময় বরফের খণ্ডগুলো একে অন্যের সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে ছোট হয়ে যায় এবং তা ছোট ছোট আকারের শিলা হিসেবে নেমে আসে।

এই শিলাবৃষ্টির কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরিবেশবিদ বলছেন, এবার যেমন বৃষ্টি ছন্নছাড়া হবে, তেমনই খরার আশঙ্কাও আছে। মাটি ফুটিফাটা হতে পারে। তার উপর শিলাবৃষ্টি হলে মাটি জল কম পাবে, ফলে ফলন ভাল হবে না। জমিতে পরিপক্ক ফসলেরও ক্ষতি হবে। ফলন বাড়াতে নানা ধরনের সার ও কীটনাশকের প্রয়োগ করা হয়। ফলে মাটিতে বিভিন্ন রকম টক্সিন জমে যাকে। বৃষ্টির জল এই টক্সিন ধুয়ে দেয় এবং মাটির গুণমান বাড়ায়। কিন্তু যদি বৃষ্টি ছিটেফোঁটা হয়, পরিবর্তে শিলাবৃষ্টি হয় তাহলে মাটির টক্সিন, রাসায়নিক জমতে জমতে মাটির গুণ আরও খারাপ করে দেবে। একসময় মাটি শুকিয়ে ফেটে যাবে, ফলে সেই জমিতে চাষই ভাল করে হবে না।
এবার বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকবে, এমনটাই পূর্বাভাস দিলেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ সৌমেন্দ্রবাবু। তিনি বলছেন, বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি হবে। ঘন ঘন বাজ পড়বে। তাই সতর্ক থাকতে হবে।

বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমান যদি বেশি হয় এবং চারপাশে পরিবেশের তাপমাত্রা যদি বাড়ে, তাহলে সেই আর্দ্র ও উত্তপ্ত বায়ু দ্রুতগতিতে ঠান্ডা হয়ে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি করে। দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলের উপরের অংশের তাপমাত্রা নীচের তুলনায় কম থাকে। তাই এই বজ্রগর্ভ মেঘের প্রবাহ নীচ থেকে উপরের দিকে হয়, যাকে বলে থান্ডার ক্লাউড। এই মেঘের মধ্যে জলীয় বাষ্পের বাড়তে থাকলে তাদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি হয়, ফলে ছোট ছোট জলকণা, তুষারকণা তৈরি হয়। এদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলেই বৈদ্যুতিক আধান তৈরি হয়। যখন জলীয় বাষ্পের পরিমাণ পাঁচ মিলিমিটার ছাড়িয়ে যায় তখন জলের অনুগুলো আলাদা হয়ে তড়িৎ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান তৈরি করে। ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি হয়। আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যায়।
বজ্রপাত তখনই হয় যখন মেঘের মধ্যে এই তড়িৎ ঋণাত্মক বা ইলেকট্রন চার্জের পরিমাণ বেড়ে যায়, বিপরীতে মাটিতে তড়িৎ ধনাত্মক চার্জ জমা হয়। বজ্রগর্ভ মেঘ ও মাটিতে তৈরি হওয়া দুই বিপরীত ধর্মী চার্জের পরিমান বাড়লে মাঝের বাতাসের বাধা অতিক্রম করে একটি লাইন তৈরি হয়, যাকে বলে স্টেপড লিডার (Stepped leader)। মেঘে যে শক্তিশালী ক্ষেত্র তৈরি হয় তার প্রতি ইঞ্চিতে প্রায় ১০ হাজার ভোল্ট বিদ্যুৎ শক্তি থাকে। ফলে চারপাশের বাতাসও আয়নিত হয়ে যায়। ফলে এই পথেই মেঘ থেকে বিদ্যুৎ শক্তি মাটিতে নেমে আসে। তখন আমরা বলি বজ্রপাত হয়েছে। বজ্রপাত হওয়ার সময় বিদ্যুৎ শক্তি বিভিন্ন সূক্ষ্ম দূষণ বলেয়র মধ্যে দিয়ে নীচের দিকে নেমে আসে। বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম দূষিত কণা বা অ্য়ারোসল, ধূলিকণার সংস্পর্শে এসে তার ধ্বংসাত্মক শক্তি আরও বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন: ছ'টা ঋতুই তো আর নেই, এ কেমন আবহাওয়া বঙ্গে? কেন গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতের হিসেবই থাকছে না
আইএমডি-র হিসেব বলছে, ২০১৯-২০২০ সাল অবধি বজ্রপাতের ঘটনা সাঙ্ঘাতিকভাবে বেড়েছে ভারতে। এই সময়ের মধ্যে চার লাখের বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত ও ছোট নাগপুর মালভূমি অঞ্চল বজ্রপাতের হটস্পট হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে বজ্রপাতে ভারতে মৃত্যু হয়েছে ২,৮৭৬ জনের, গত বছর ২,৩৫৭ জনের। এর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বিহারে প্রায় ৪০০ জন, মধ্যপ্রদেশে ৪০০ জন, ঝাড়খণ্ডে ৩৩৪ জন ও উত্তরপ্রদেশে ৩২১ জন। পশ্চিমবঙ্গে বজ্রপাতে মৃত্যু বেড়েছে। এর কারণ হল অত্যধিক পরিবেশ দূষণ, বাতাসে ভেসে থাকে ধাতব কণা যা ঘন ঘন বজ্রপাতের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। বাতাসে জলীয় বাষ্প ও ধূলিকণার পরিমাণ বাড়ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে অনেক বেশি বাতাস নীচ থেকে উপরে উঠে থান্ডার ক্লাউড তৈরি করছে। ফলে মেঘ থেকে ভূমিতে বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে। গত দু'দিনে পশ্চিমবঙ্গেই বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৮ জনের।