
শেষ আপডেট: 6 June 2018 12:50
চটা ওঠা কংক্রিট মেঝে। দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘর। তাতেই গাদাগাদি বাস গোটা পরিবারের। ঘরের একপাশে হাট ফেরত কদম কাঠের আলনা। অন্যপাশে মান্ধাতার আমলের তক্তপোশ। এর মাঝেই, যেন কিছুটা কুণ্ঠিত হয়েই জায়গা করে নিয়েছে সাকুল্যে দু'ফুট বাই তিন ফুটের একটি ঘুনে ধরা চাইনিজ প্লাইয়ের টেবিল। তার ওপর অগোছালো চেয়ে আছেন কেসি নাগ কিংবা পিকেদে সরকার। আর উপরের সস্তা টিনের দেওয়ালে সাড়ে পাঁচ টাকার ড্রইং শিটের ডান সাইডে এক ঝাঁ চকচক রয়্যাল এনফিল্ডের ছবিকে জায়গা ছেড়ে, বাঁ দিকে সেঁটে বসে চেয়ে রয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। সব মিলিয়ে এই হল স্বামীজির দর্শনকে সঙ্গী করা কামখ্যাগুড়ির তাপস দেবনাথের সারস্বত-স্বর্গ। সদ্য প্রকাশিত মাধ্যমিক মেধা তালিকায় অষ্টম স্থান ছিনিয়ে নিয়ে বুধবারের ডুয়ার্সের সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে তাপস ।
বুধবার সকাল থেকেই ভিড় উপচে পড়ছে তাপসদের বাড়ির উঠোনে। কামাখ্যাগুড়ির পুলের পাড়ে এক চিলতে জমিতে বাঁশ-কাঠ-সস্তা টিনের একচালা ঘর তার পরিবারের। বাবা রতন দেবনাথ সবজি বেচেন নামনি অসমের কোকরাঝাড়ে। তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়া ভাই ও মা সেখানেই রয়েছে। কাকা স্বপন দেবনাথ পেশায় দর্জি। তাঁর সামান্য আয় দিয়েই চলে তাপসের পড়াশোনার খরচ।
বহু লড়াইয়ে মেধা তালিকায় নিজের নাম তুলেছে সে এবং এই লড়াইয়েই যে তার জীবনের কাঁটা বিছোনো পথ মসৃণ থেকে মসৃণতর হতে পারে, সেটা তার অজানা নেই। গর্বিত কামাখ্যাগুড়ির একটা বড় অংশকে বুধবার বিকেলে নিজের বাড়িতে উপস্থিত হতে দেখে, এটা বুঝতে দেরি হয়নি প্রথম স্থান থেকে মাত্র সাত নম্বর পিছিয়ে থাকা তাপসের।
দারিদ্র্য মানুষকে জেদ দেয়, আর সেই জেদেই প্রাপ্য অধিকার ছিনিয়ে আনবার তীব্র আকুতিতে নিম্নবিত্ত দোরগোড়ায় কড়া নাড়ে সাধনার সাফল্য। কামাখ্যাগুড়ির তাপস দেবনাথকে নিয়ে এই আপ্তবাক্যই আপাতত ঘোরাফেরা করছে ডুয়ার্সের গলি থেকে রাজপথে । যৌথ পরিবারের দিন আনি দিন খাই দারিদ্র্যকে নিত্যসঙ্গী করে এক অলৌকিক চাবির সন্ধান পেয়েছে মাধ্যমিক মেধায় আট নম্বর স্থানে থাকা তাপস ।
গর্বিত পরিবার স্বজন শিক্ষকদের সামনে রেখে , উচ্ছ্বসিত বন্ধুদের কাঁধে চেপে তার শক্ত চোয়াল যেন বলে, আগামীর দিন বদলের স্বপ্নের তালা এই চাবি দিয়েই খুলতে হবে।