
শেষ আপডেট: 12 June 2019 13:46
মধুরিমা রায়
সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন, তিন জন মহিলা শুয়ে আছেন। মাথায় জল ছেটাচ্ছেন একজন। আর এক মহিলা বসে আছেন একটা চেয়ারে। কথা বলতে পারছেন না, হাঁপাচ্ছেন। তাঁদেরই পাশে একটি বেসরকারি বাংলা সংবাদ চ্যানেলের চিত্র সাংবাদিক।
আধশোয়া তিনি। একইভাবে হাঁপাচ্ছেন। কথা বলতে পারছেন না। চারিদিকে টুকরো টুকরো ভিড়। কী হয়েছে? কাঁদানে গ্যাসে শ্বাসকষ্ট, দম হাঁসফাস, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কেউ বলছেন, এবারে যে ধরনের কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে, তার পরীক্ষা করা দরকার। আগে কখনও এমন করা হয়নি। এতে অসম্ভব বেশি শরীর খারাপ করছে, চামড়া জ্বালা করছে, আর অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার প্রভাবও থাকছে। ঘটনার পরে প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেলেও, মেট্রো স্টেশনে এসেও তাঁদের সমস্যা কমেনি। সুস্থ হওয়ার কোনও লক্ষণই নেই তাঁদের। চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা যদিও বা করা হয়েছিল, তবে কোন হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে গেলে সুস্থ হবেন খড়দার ওই মহিলারা, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন সঙ্গে থাকা লোকজন। কারণ হাসপাতালগুলোরও তো বিশৃঙ্খল অবস্থা।
বিজেপি বলছে, এই ‘বিশৃঙ্খল’ অবস্থা সারা রাজ্য জুড়েই। অরাজকতা এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক পরিবর্তন আনতে উদ্যোগী দলের নেতা-নেত্রী থেকে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা। আর তাঁদের উদ্যোগেই বুধবার লালবাজার অভিযানের ঘোষণা ছিল আগে থেকেই। সেই অভিযানে যে, গণ্ডগোলও হবে, তাও আন্দাজ করা গেছিল। কিন্তু সেই গণ্ডগোলের সময় বা পরিসর কম হলেও, তাতে ব্যবহার করা কাঁদানে গ্যাস যে এতটা অসুস্থ করে দিতে পারে মানুষজনকে, তার ধারণা অনেকেরই ছিল না। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট থেকে মিছিল প্রায় দেড়টা নাগাদ বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের দিকে আসতে শুরু করে। মিছিলে খুব যে বেশি লোক ছিল তাও নয়, তবে জয় শ্রী রাম ধ্বনি, বিজেপির পতাকা সবই সামিল ছিল। মাঝ রাস্তায় একবার বসেও পড়েন তারা। তারপর আবারও শুরু করেন এগোতে। আর এ সময়েই আবারও ব্যারিকেড। আর চেনা ছবি অনুযায়ীই সেই ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা।
সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা খুব স্বাভাবিকভাবেই, লাইভ-ভিডিয়ো, ছবি করতে ব্যস্ত ভীষণ। শুরু হয়েছে মিছিল লক্ষ্য করে জলকামানের ব্যবহার। এ পর্যন্তও চেনা ছবি। হঠাতই জলকামানের মুখ ঘুরে গেল সাংবাদিকদের দিকে! ক্যামেরা থেকে বুম সব তখন স্নান করে ফেলেছে। এ পর্যন্তও সাংবাদিকরা দাঁড়িয়ে থাকেন, ময়দান ছাড়তে নেই তাঁদের। তারপর শুরু হয়, কাঁদানে গ্যাসের শেল আসা। ততক্ষণে কিন্তু মিছিলের ম-ও নেই। সবাই এদিক ওদিক পালাচ্ছেন। হ্যাঁ, পালাচ্ছেন, কারণ কাঁদানে গ্যাস কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দিচ্ছে না। সাংবাদিকরাও বাধ্য হলেন আশপাশের গলিতে গিয়ে দাঁড়াতে। সে সময় তাঁদেরই কারও দমবন্ধ হয়ে আসছে, কেউ বা বুঝতে পারছেন না কী করবেন তখন! কারণ হাত পা কাঁপছে তাঁদের। যে সব বাড়িগুলোর দরজায় সাংবাদিকদের আশ্রয় নিতে হয়েছিল, এগিয়ে এসেছিলেন বাড়ির লোকজন। হাতে রয়েছে জলের মগ, বালতি, বোতল। তাঁরা বারবরাই একটাই কথা বললেন, “আমরা বাড়ির ভিতরে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছি, আপনারা কী করে পারবেন! আসুন জল নিন”। সে সময়ে মুখ চোখ ঘসা যায় না একেবারেই, তাতে হিতে বিপরীত। সঙ্গে জল খেতেও পারা যায় না। খুব আস্তে আস্তে শ্বাস নিয়ে স্বাভাবিক হতে হয়। সেভাবেই প্রায় ১৫-২০ জন সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিক মিলে ধাতস্থ হলেন। আবারও মিছিল দেখতে ছোটা। এবার সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের মোড়েই অন্য বিপত্তি। বিজেপি কর্মী সমর্থকরা পুলিশকে লক্ষ্য করেই ছুঁড়ছেন ঢিল-পাটকেল। পুলিশরা হেলমেট পরে রয়েছেন, কিন্তু সাংবাদিকরা কী করবেন! ক্যামেরা বাঁচাবেন, না পেটের তাগিদে দাঁড়িয়ে থাকবেন ঢিল খেতে! যদিও খুব কম সময়ের এই ঘটনা। তবুও ছাপ তো রাখল।
এ দিন সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে অভিযান শুরু করেছিল বিজেপি। এই অভিযান ঘিরে গন্ডগোলের আশঙ্কা আগেই ছিল। প্রশাসনও প্রস্তুত ছিল। তাই মিছিলে যে সব রাস্তা দিয়ে যাবে, সেই সব জায়গায় কড়া পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে রেখেছিল রাজ্য প্রশাসন। অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে জায়গায় জায়গায় প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ও বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটে ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। লালবাজারের সামনেটা ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়। এই অভিযান ঘিরে পুলিশের ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যব্সথায় পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছিল ইলেকট্রিক শিল্ড। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামলাতে এই বিশেষ ধরনের শিল্ডের ব্যবস্থা করা হয়। কোনও ব্যক্তির গায়ে এই শিল্ড ঠেকিয়ে লাল বোতাম টিপলেই ইলেকট্রিক শক দেওয়া যাবে। কোনও বিক্ষোভকারী বেপরোয়া হয়ে উঠলে, তাঁকে নিয়ন্ত্রণে আনতে এই শিল্ড ব্যবহার করার অনুমতিও ছিল এবার পুলিশের কাছে। পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সময় গায়ে ঠেকিয়ে রাখলে ওই ব্যক্তি মাটিতে পড়ে যেতে পারেন। এর আগে রাজ্যে এই ধরনের শিল্ড ব্যবহার করতে দেখা যায়নি পুলিশকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ এই ধরনের শিল্ড ব্যবহার করেছে। নজরদারি চালাতে ড্রোনের সাহায্যও নেওয়া হয় এদিন। এই মিছিলের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৩ হাজার পুলিশ কর্মী, র্যাফ কুইক অ্যাকশন দল মোতায়েন করা হয়েছিল।
https://www.youtube.com/watch?v=jzefHBYfzBk&feature=youtu.beদুটো নাগাদ আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে দিলীপ ঘোষ বলেন, গন্ডগোলের আশঙ্কায় নবান্নের গেটে তালা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আন্দোলন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়বে। মমতার সরকার আর বেশি দিন নেই, বলেছেন কৈলাস বিজয়বর্গীয়। বাংলাকে সামলাতে পারছেন না, মমতার পদত্যাগ করা উচিত, বলেছেন হুগলির বিজয়ী সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়। মিছিল বিজেপি নেতা রাহুল সিংহ স্লোগান তোলেন ‘দ্যাখ বিজেপির ক্ষমতা, ভয় পেয়েছে মমতা’। বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু কটাক্ষ করে বলেন, রাজ্য জুড়ে আগুন জ্বলছে, মুখ্যমন্ত্রী মূর্তি উদ্বোধন করছেন!
মিছিলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বিজেপি নেতা রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়। মিছিলের একেবারে সামনের দিকেই ছিলেন তিনি। কাঁদানে গ্যাসের জেরেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানা গিয়েছে। রাস্তাতেই তিন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কাঁদানে গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আরও কয়েকজন বিজেপি কর্মী-সমর্থক। লকেটও জানান, ব্যারাকপুর ও হুগলি থেকে আসা বিজেপির মহিলা মোর্চার ৬ জন সদস্য কাঁদানে গ্যাসে এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যে তাঁদের শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিজেপি রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘‘আমাদের মিছিলে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ভাবে মিছিল হচ্ছিল, কোনওরকম সতর্ক না করেই আমাদের সাংসদ, শীর্ষ নেতাদের উপর কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হয়েছে’’। এমনকি, কোনও অ্যাম্বুল্যান্স রাখা ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন বিজেপি নেতারা।
সাংবাদিক হোন, সাধারণ কর্মী সমর্থক বা নেতা স্থানীয় কেউ, আজকের ধুন্ধুমার পরিস্থিতে সকলের কাছেই ভিলেন কাঁদানে গ্যাস!