
শেষ আপডেট: 28 October 2023 12:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো, আলিপুরদুয়ার: কোজাগরী পূর্ণিমার আগের রাত যে! মায়াবী আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। চায়ের সুগন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। হাতের আঙুলের কারসাজিতে দুটি পাতা-একটি কুঁড়ি ডালায় ফেলেন যে শিল্পীরা মাঝরাতেও যেন ব্যস্ততার শেষ নেই তাঁদের। শুক্রবার আলিপুরদুয়ারের মাঝেরডাবরি চা বাগানে চলল ফুল মুন প্লাকিং। প্রায় একশো জন চা শ্রমিক চাঁদের আলোয় চা তুললেন। স্বাদ-গন্ধে এই চা নাকি অতুলনীয়। তাই বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা।
যদি ভাবেন প্রতি পূর্ণিমাতেই হয় এই চা পাতা তোলার আয়োজন, তবে ভুল ভাবছেন। কোজাগরী বা বুদ্ধ পুর্ণিমার মতো বাছাই করা দু’টি বা তিনটি পূর্ণিমাকে ফুল মুন প্লাকিংয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয়। আবহাওয়া ও চায়ের বাজার দেখে নির্বাচন করা হয় এমন মোহময়ী রাত। মাঝেরডাবরি বাগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, শুক্রবার বিকেল ৫ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত প্রায় ২০০০ কেজি চা পাতা তুলেছেন ১০০ জন মহিলা চা শ্রমিক।
চা বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর অন্য গাছের মতোই চা গাছও খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। সাধারণ দিনেও এই সময় চা গাছের পাতায় নাইট্রোজেন ও ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর ভরা পূর্ণিমায় বেড়ে যায় চা পাতার অন্যান্য গুণাগুণও। তাই এই সময় চা গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা পাতা থেকে তৈরি চা স্বাদে, গন্ধে ও গুণে হয় অতুলনীয়। ‘ফুল মুন টি’ নামেই এর খ্যাতি।
মাঝের ডাবরি চা বাগানের ম্যানেজার চিন্ময় ধর বলেন, “যে কোনও ফুলের গন্ধ দিনের থেকে রাতেই পাওয়া যায় বেশি। অর্থাৎ রাতে গাছের পাতা ও ফুলের গুণাগুণ বেশি থাকে। পাহাড়ে বিভিন্ন চাবাগান পূর্ণিমার রাতে চা পাতা তুলে চা তৈরি করে। সমতলে আমরাই প্রথম এই চা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। গত চার বছর ধরে এই চা তৈরি করছি আমরা। ভোর পাঁচটা থেকে সকাল আটটার মধ্যে কাঁচা চা পাতা থেকে চা তৈরির প্রক্রিয়া শেষ করে প্যাকেটজাত করে ফেলা হবে। চায়ের বাজারে দারুন কদর রয়েছে ‘ফুলমুন টি’র।”
৩১ সি জাতীয় সড়কের ধারে প্রায় আট হেক্টর জমিতে মাঝেরডাবরি চা বাগান। তারমধ্যে ৬ হেক্টর জমি থেকে এদিন কাঁচা চা পাতা তোলা হয়েছে। সকাল থেকেই তারজন্য প্রস্তুতি শুরু করে বাগান কর্তৃপক্ষ। বাগানে চারদিকে বেশ কিছু সার্চলাইট লাগানো হয়। দিনের আলো থাকা পর্যন্ত বাগানে ঢুকে রীতিমতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে কোথাও কোনও বিষধর সাপ বা চিতাবাঘ লুকিয়ে রয়েছে কিনা? রাতে বাগানে ঢোকার আগেই প্রত্যেক শ্রমিককে গামবুট পরানো হয়। রাতের অন্ধকারে মশাল জ্বালিয়ে পাতা তোলা শুরু হতে অনেক যানবাহন জাতীয় সড়কে দাঁড়িয়ে যায়।
আলিপুরদুয়ার চেচাখাতার বাসিন্দা সঞ্চিতা দত্তও এদিন ছেলেকে নিয়ে এই দৃশ্য দেখতে চাবাগানে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “সকালে হাঁটতে এসে চাঁদের আলোয় চা পাতা তোলার কথা শুনি। ছেলেকে নিয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করতে চলে এসেছি। শুনেছি এই চায়ের খুব দাম। ১৫০০ টাকা কেজি। এই চা কিনে খাওয়া কি আর আমাদের পক্ষে সম্ভব! তবে এই অসাধারণ সুন্দর এক দৃশ্যের সাক্ষী থাকতে পেরে খুব ভাল লাগছে।” চাঁদের আলোয় চা তৈরি উপলক্ষে মাঝের ডাবরি চা বাগানে ছিল একেবারে সাজো সাজো রব। ডাবরি টি লাউঞ্জে ধামসা মাদলের তালে নাচছিলেন জনজাতি মেয়েরা। মায়াবী চাঁদের রাতে সেই অনাবিল সুন্দর দৃশ্য দেখতে এদিন ভিড় করেছিলেন আশপাশের বহু মানুষ।