
শেষ আপডেট: 23 September 2023 02:33
১৮৩টি দেশের মানুষকে এইডস নিয়ে সচেতন করেছেন। আর আটটি দেশে এই কাজ সেরে চলতি বছরেই ঘরে ফিরবেন সুন্দরবনের সোমেন। ঘর ছাড়া আর ঘরে ফেরার মধ্যে কেটেছে কুড়ি-কুড়িটা বছর। এই দীর্ঘ সময়ে হারিয়েছেন কাছের অনেককেই। বাবা, দাদু, দিদিমা এবং মামাকে হারানোর খবর শুনেছেন বিদেশে বসেই (World Tour)। চোখের জল ফেলেছেন। আবার নতুন করে মন শক্ত করে সামনের দিকে তাকিয়েছেন।
সাইকেল নিয়ে বিশ্বভ্রমণ শেষ করে আগামী ১০ ডিসেম্বর দেশে ফিরবেন সুন্দরবনের সোমেন (Sunderban Soumen)। ১৭ ডিসেম্বর ক্যানিং থেকে সোনাখালি পর্যন্ত এক সাইকেল র্যাসলি অনুষ্ঠানেও তাঁর যোগ দেওয়ার কথা। থাইল্যান্ড থেকে শুক্রবার এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। বিশ্বের আরও আটটি দেশে এই প্রচার এখনও বাকি। সেই কাজ শেষ করছেন এখন।

কলেজে জুলজি আর পাশাপাশি ফাইন আর্টসের ডিগ্রি শেষে তিন মাসের প্রস্তুতি। তারপর ২০০৪ সালের ২৭ মে বাবা-মাকে বিদায় জানিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এইচআইভি এইডস নিয়ে প্রচারে। প্রথম দু'বছর ঘুরলেন সমগ্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দেখা করেছেন দেশের ২৫ টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও ২৬ জন গভর্নরের সঙ্গে। এরপর দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশে পাড়ি। দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে তাঁকে ফ্ল্যাগ অফ করেছিলেন তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়।

শুরুর সেসব দিনের কথা বলতে গিয়ে সোমেন জানান, পাকিস্তান পার হয়ে আফগানিস্তানে ঢুকতেই বিপত্তি। কাবুল শহরের অদূরে তালিবানদের হাতে পড়েন। দিন চারেক খেতে দেওয়া হয়নি তাঁকে। শুধুই চলে মারধর। পরে রাঁধুনির কাজে নিয়োগ করা হয় তাঁকে। সোমেনের কথায় ‘আমি হতাশ হয়নি। সব অত্যাচার সহ্য করছিলাম। ধীরে ধীরে ওরা বুঝল আমার কোনও খারাপ উদ্দেশ্য নেই। তখন আমাকে রাঁধুনির কাজে নিযুক্ত করে। ১১ দিন ওদের রান্নার কাজ করেছিলাম। আমার হাতের রান্না খেয়ে মন গলে। ২৪ দিন বাদে ঘোচে বন্দিদশা।’’ ডাকাতের হাতে নিঃস্ব হওয়ার মতো খারাপ অভিজ্ঞতা যেমন হয়েছে। তেমনি ভালো অভিজ্ঞতাও রয়েছে প্রচুর। গভীর সঙ্কট আর প্রাচুর্য দুটোই দেখেছেন পাশাপাশি।
জানালেন, ২০১১ সালে উত্তর মেরুতে মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে জমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ইউরোপ হোক বা মধ্যপ্রাচ্য অথবা আফ্রিকা, ভারতীয়রা ঠিক খুঁজে নিয়ে আপন করে নিয়েছেন সোমেনকে। ৩৮ টি দেশের প্রেসিডেন্ট, ৭২ টি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে তাঁর। এত লোকের মাঝে আজও সোমেনের চোখে দেখা সব থেকে সুখী মানুষ হলেন একজন বাংলাদেশী। যিনি মাত্র ২০ টাকা দৈনিক রোজগারেও নিজের পরিবারকে নিয়ে আনন্দে দিন কাটান।
সোমেন জানান, যেখানেই গিয়েছেন সেখনকার স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, রেস্টুরেন্ট হোক বা ফ্যাক্টরি, সব জায়গাতেই ওয়াকর্শপ করেছেন। মুগ্ধ হয়েছে সকলেই। এইচআইভি, এইডস্ এর পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতির উপরও নানা সেমিনারে বলার সুযোগ পেয়েছেন।

সবকিছু ছেড়ে সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ কেন? সোমেনের মতে, এর চারটে কারণ ছিল। প্রথমত তাঁর কোনও স্পনসর ছিল না। দ্বিতীয়ত সাইকেল হচ্ছে মানুষের কাছে পৌঁছনোর সব থেকে সেরা মাধ্যম বলে সবসময় মনে হয়েছে তাঁর। তৃতীয়ত এতে কোনও পরিবেশ দূষণ হয় না। চতুর্থত ফিট থাকবার জন্য সাইক্লিং এর কোনও বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, ‘‘সাইকেলে ঘুরতেও খরচ আছে। কোনও স্পনসরশিপ ছাড়া শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সাহায্যে এতদুর এসেছি। লোকজনের সাহায্য ছাড়া এইযাত্রা সম্ভব হত না।’’
এইডস মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন চোখে নিয়ে প্রায় দুলক্ষ কিলোমিটার সাইকেল পাড়ি দিচ্ছেন তিনি। ২০০৯ সালে এশিয়া মহাদেশ, ২০১১ সালে ইউরোপ, ২০১৫ সালে আফ্রিকা, ২০১৬ সালে দক্ষিণ ওউত্তর আমেরিকা, ২০১৮ সালে কানাডা, সাইবেরিয়া, রাশিয়া ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ফিলিপিন্স নিউজিল্যান্ড। চলতি বছর ডিসেম্ববরেই মালয়শিয়া, বাংলাদেশ মায়নমার হয়ে দেশে ফিরবেন সুন্দরবনের সোমেন দেবনাথ। ছেলেকে দেখার জন্য মায়ের অপেক্ষা শুরু হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: 'আর একটু ঘুমোব', ইসরোর অ্যালার্ম শুনে চোখ বুঝল বিক্রম-প্রজ্ঞান, জাগবে কবে