
শেষ আপডেট: 17 September 2021 11:33
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের তরফে ইতিমধ্যেই আক্রান্ত জেলাগুলিতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। হাসপাতালগুলিতে পেডিয়াট্রিক বেড বাড়ানো হচ্ছে বলে খবর। পিজি হাসপাতাল ও মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালে আরও ৯০টি এনআইসিইউ বেড বাড়ানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসএসকেএমের একটি বৈঠকে বলেছিলেন, অজানা জ্বর নয়, এমনিই জ্বর হচ্ছে বাচ্চাদের। বিশেষজ্ঞের দল গোটা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
জ্বরের প্রকোপ রাজ্যের কোথায় কেমন ?
বিশেষজ্ঞের টিম বলছে, ১ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে জ্বর, ডায়েরিয়া, শ্বাসের সমস্যা ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে ১১৯৫ জন ভর্তি হয়েছে। এখনও অবধি ২ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। জলপাইগুড়ি ও আশপাশের এলাকায় হাসপাতালগুলিতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দু’হাজার ছাড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে এত বেশি রোগী জ্বর বা নিউমোনিয়ার সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হননি। শিশুদের মধ্যেও এত মারাত্মকভাবে অসুখ ছড়াতে দেখা যায়নি।
জেলা হাসপাতালের পাশাপাশি গ্রামীণ হাসপাতালগুলোতেও এই ধরনের উপসর্গ নিয়ে প্রচুর শিশুকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে আসছেন অভিভাবকরা। একদিকে জলপাইগুড়ি জ্বরের প্রকোপ মারাত্মক, অন্যদিকে উত্তর দিনাজপুরেও অজানা জ্বর ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দুই দিনাজপুর থেকেই রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজে জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে শিশুরা। আক্রান্তদের বয়স ৫০ দিন থেকে তিন বছর। অন্যদিকে, মালদহ মেডিক্যাল কলেজে জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি দেড়শোরও বেশি শিশু। গত তিন দিনে মোট পাঁচ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
কী ধরনের রোগ হচ্ছে
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের পাঁচ বিশেষজ্ঞের টিম জানিয়েছে, এখনও অবধি জ্বরের সঠিক কারণ জানা যায়নি। তবে নানা ধরনের ভাইরাসের প্রকোপ বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে যা রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ভাইরাল জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে অনেক শিশু। জ্বর, সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা, গলা শুকিয়ে যাওয়া, মাথা যন্ত্রণা, ঝিমুনি, প্রচণ্ড দুর্বলতা, আচমকা অজ্ঞান হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া শুকনো কাশি, গলা শুকিয়ে যাওয়া, গলায় অস্বস্তি, গলার স্বর বদলে ও শ্বাসের সমস্যা হচ্ছে অনেকের।
ডেঙ্গিও ছড়িয়েছে। ডেঙ্গি জ্বরে গা হাত পা ব্যথা করে, মাথার যন্ত্রণা হয়। আরও একটা লক্ষণ হল, পেটে ব্যথা আর বমি বমি ভাব। সঙ্গে ডায়রিয়া আর ধুম জ্বর। এমন লক্ষণও দেখা গেছে।
আবার জাপানি এলসেফেলাইটিস ছড়িয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমে রোগের ধরন দেখে অনুমান করা হয়েছিল কিছুক্ষেত্রে জাপানি এনফেলাইটিস হলেও হতে পারে। স্ত্রী কিউলেক্স মশা থেকে জাপানি এনসেফেলাইটিসের জীবাণু ছড়ায়। এই রোগের ভাইরাস সরাসরি মস্তিষ্কে হানা দেয়। তা ছাড়া, জ্বর, বমি, মাথাব্যথা, ঝিমুনি তো রয়েছেই।
স্ক্রাব টাইফাসের উপদ্রব বেড়েছে বলেও জানাচ্ছেন জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা। ডেঙ্গি এবং স্ক্রাব টাইফাসের রোগের লক্ষণ অনেকটা একই। তাই অনেক সময় রোগ নির্ণয়ে সমস্যা হয়। এডিস মশার কামড়ে যেমন ডেঙ্গি হয়, তেমনই এই ব্যাকটিরিয়া দেহে ঢোকে ছোট্ট একটা লাল পোকার কামড়ে। ‘ট্রম্বিকিউলি়ড মাইটস’ নামে ওই পোকা কামড়ালে কিছু বোঝা যায় না, পরে প্রবল জ্বর আসে। ঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে সব অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে থাকে। জ্বরের ধরন ও পোকা কাটা স্থানের ক্ষত দেখে রোগীদের চিহ্নিত করা হয়।
আরও একধরনের ভাইরাসে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন ডাক্তারবাবুরা, তা হল আরএস ভাইরাস তথা রেসপিরেটারি সিনসিটিয়াল ভাইরাস। কলকাতা মেডিক্যালে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে কয়েকটি শিশু। যদিও এ ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য এখনও মেলেনি, তবে আক্রান্তদের উপসর্গ ও রোগের লক্ষণ দেখে প্রাথমিকভাবে অনুমান করছেন চিকিৎসকরা। করোনার মতোই সিঙ্গল স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ ভাইরাস। একে বলা হয় হিউম্যান রেসপিরেটারি সিনসিটিয়াল ভাইরাস (hRSV)। মূলত শ্বাসনালীতে সংক্রমণ ছড়ায় এই ভাইরাস। ছোঁয়াচে, দ্রুত ছড়াতে পারে। একবার শরীরে ঢুকলে ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়ায়। শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। শরীরে ভাইরাল লোড বাড়লে প্রবল শ্বাসকষ্টও হতে পারে। শিশুরা এই ভাইরাসের প্রকোপে পড়লে ব্রঙ্কিওলাইটিস হতে পারে, বড়দের নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'