
শেষ আপডেট: 22 November 2019 09:43
আগামী ২৫ তারিখ ভোট। নদিয়া জেলার বিধানসভা হলেও এই কেন্দ্র মুর্শিদাবাদ লোকসভা আসনের মধ্যে পড়ে। ১৬-র ভোটে করিমপুর থেকে জিতেছিলেন তৃণমূলের মহুয়া মৈত্র। ১৯-এর ভোটে জিতে তিনি এখন কৃষ্ণনগরের সাংসদ। তাই উপনির্বাচন হচ্ছে এই বিধানসভায়।
এই ভোটে তৃণমূল প্রার্থী করেছে বিমলেন্দু সিংহ রায়কে। বিমলেন্দুবাবু পেশায় শিক্ষক। দীর্ঘদিনের তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা। মহুয়ার ছেড়ে আসা আসনে তাঁকেই প্রার্থী করেছে শাসকদল। অনেকের মতে, এই কেন্দ্রে যতটা না বিমলেন্দুবাবু প্রার্থী তার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানের লড়াই মহুয়ার। তাই বিধানসভা ধরে রাখতে সাংসদও এখন শীতকালীন অধিবেশন ছেড়ে উপনির্বাচনের প্রচারে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন।
বিজেপি এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে জয়প্রকাশ মজুমদারকে। একদা কংগ্রেস নেতা জয়প্রকাশবাবু রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র তৃণমূল বিরোধী হিসেবেই পরিচিত। গত কয়েক বছর আগেই তিনি যোগ দেন গেরুয়া শিবিরে। দলের অন্যতম মুখপাত্র জয়প্রকাশবাবুকে দাঁড় করিয়েই করিমপুর দখলের ব্লুপ্রিন্ট এঁকেছে বিজেপি। মাটি কামড়ে প্রচার করছেন তিনি।
লোকসভায় বাম-কংগ্রেস আলাদা লড়লেও এবার তিন কেন্দ্রের উপনির্বাচনে জোট হয়েছে। করিমপুরে কংগ্রেস সমর্থিত বাম প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পেশায় আইনজীবী তথা সিপিএমের যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই-এর প্রাক্তন জেলা সম্পাদক গোলাম রাব্বি। অনেকের মতে, এই কেন্দ্রে ভোটের বাম-কংগ্রেস জোট লড়াইয়ে না থাকলেও, সমীকরণ বদলে দিতে পারে তারাই।
পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, একুশের বিধানসভার জন্য করিমপুরের উপনির্বাচন ইঙ্গিত দিতে পারে। কেন? তাঁদের মতে গত লোকসভার নিরিখে দেখলে এই কেন্দ্রে বিজেপির থেকে ১৪ হাজারের মতো ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল । উল্টোদিকে আবার নোটায় ভোট পড়েছিল ১৪ হাজারের আশেপাশে। লোকসভায় মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন হুমায়ুন কবীর। অনেকের মতে, প্রার্থী সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে হিন্দু ভোট বিজেপির দিকে আসেনি। সেগুলিই নোটায় পড়েছিল। এবার জয়প্রকাশকে দাঁড় করিয়ে সেই ভোট নিজেদের বাক্সে ফেরানোর ব্যাপারে আশাবাদী গেরুয়া শিবির।
তৃণমূল এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে বিমলেন্দু সিংহরায়কে। অনেকের মতে, ইচ্ছে করেই তৃণমূল এই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু প্রার্থী দেয়নি। কারণ, বিগত নির্বাচনগুলির ফলাফলই বলছে রাজ্যের মুসলমান ভোটের সিংহভাগ গিয়েছে তৃণমূলের বাক্সে। কিন্তু এখানে যদি সংখ্যালঘু প্রার্থী তৃণমূলের তরফে দেওয়া হত, তাহলে বিজেপি তা নিয়ে মেরুকরণ আরও তীব্র করত। বিমলেন্দুবাবুকে প্রার্থী করায় বিজেপির হিন্দু ভোটেও আধিপত্য থাকবে না বলেই তৃণমূলের ধারণা। সেই সমীকরণের কথা মাথায় রেখেই প্রার্থী বাছাই করেছে শাসকদল।
গোটা করিমপুর কেন্দ্রে ৪২ শতাংশ ভোটার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। করিমপুর-২ ব্লকে আবার তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, কম-বেশি ৮০ শতাংশ। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিন্যাসের কথা মাথায় রেখেই গোলাম রাব্বিকে প্রার্থী করেছেন বিমান বসু, সোমেন মিত্ররা। তাঁদের মতে, বিধানভবন আর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের নেতাদের হিসেব একেবারে স্পষ্ট। তাঁরা যেনতেন প্রকারেণ তৃণমূলের ভিতে ধাক্কা দিতে চাইছেন। কারণ তাঁরা মনে করছেন, এটা সম্ভব হলে তবেই বাংলার রাজনীতিতে তাঁদের একটা পরিসর তৈরি হবে। প্রাসঙ্গিকতা ফিরে আসবে।
সংখ্যালঘু ভোটে যদি বাম-কংগ্রেস জোটপ্রার্থী ভাগ বসাতে পারেন, তাহলে শাসক দলের চিন্তার কারণ আছে বইকি! এমনিতেই মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল-মুসলিমিন তথা মিম নিয়ে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে শাসকদলের কপালে। হায়দরাবাদের নিজামের তৈরি করা দল বাংলায় পা রাখতে চাইছে। সংগঠন গোছানোর কাজও শুরু করে দিয়েছে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির এই কট্টর মুসলিমদের দল। এ নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে দলীয় সভায় বলাও শুরু করেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে দিদির বার্তা, “ওরা বিজেপির কাছে টাকা নেয়। সংখ্যালঘুরা ভুল করবেন না। ওদের বাড়ি হায়দরবাদে। এখানে নয়।” ফলে একুশের বিধানসভার জন্য বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়ে দিতে পারে নদিয়ার এই কেন্দ্রের উপনির্বাচন।