দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তরবঙ্গের গ্রাম বাংলায় ফের বোধনের সুর। একদশীর সকাল থেকেই উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সম্প্রদায় অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে শুরু হয়ে গেছে মা ভান্ডানী রূপে দেবীর আরাধনা।
কথিত আছে বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ি ছেড়ে দেবী কৈলাশে ফেরার সময় ঘন জঙ্গলে পথ হারিয়ে সাধারণ নারীর রূপ ধরে কাঁদছিলেন। ওই সময় এক রাখাল একটি মেয়েকে জঙ্গলে বসে কাঁদতে দেখে তাঁকে রাতে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন। মাঝরাতে দেবী নিজের রূপে দেখা দিয়ে ওই কৃষককে বলেন, ‘তুই আমাকে আশ্রয় দিয়েছিস। তুই আমার থেকে কী বর চাস?’’
তখন কৃষক বলেন, ‘মা ঘন জঙ্গলে চাষ করতে পারি না। তাই আমাদের খুব খাবারের অভাব। এই এলাকাকে তুমি শষ্য শ্যামলা করে দাও।’’ তাঁর কথা শুনে দেবী তুষ্ট হয়ে বর দেন। পরদিন সকাল থেকে তিস্তার পার বরাবর শস্য শ্যামলা হয়ে ওঠে। সেই থেকে পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে ময়নাগুড়ি-সহ ডুয়ার্সের বিভিন্ন এলাকায় একাদশীর দিনে ভান্ডানী রূপে দেবী দুর্গার পুজো হয়ে আসছে।
দেবী এখানে মহিষাসুর মর্দিনী নয়। দেবী এখানে সাধারণ নারীর রূপে পূজিতা। দ্বিভুজা। একসময় প্রচুর বাঘ ছিল তিস্তাপারের জঙ্গলে। কথিত তাই এখানে দেবী দুর্গা সিংহের বদলে বাঘের উপর অধিষ্ঠিতা। দেবীর সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক,গণেশ থাকেন। কিন্তু কোনও অসুরের উপস্থিতি নেই।
এই পুজো ঘিরে ময়নাগুড়ির ভান্ডানী এলাকায় প্রতিবার লাখো মানুষের ঢল নামে। রাতভর চলে পুজো ও মেলা। কয়েকশো ছাগল ও অগুন্তি পায়রা বলি হয়। কিন্তু এবার স্বাস্থ্য বিধি মেনে পুজো হওয়ায় মেলা বন্ধ। মানুষের ভিড়ও এবার অনেক কম। ময়নাগুড়ির বাসিন্দা বছর ৭৬ এর শিবেন রায় বলেন, ‘‘ছোট থেকে বাবা মার হাত ধরে এখানে মা ভান্ডানীর পুজো দিতে আসছি। পূজো দিয়ে সারারাত মেলা দেখে পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু এবার করোনা সংক্রমণ। তাই মেলা হচ্ছে না। সব কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। পুজো দিয়ে বাড়ি ফিরে যাবো।’’
পুজো কমিটির সম্পাদক দীনেশচন্দ্র রায় বললেন, এবছর সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পুজো করতে হচ্ছে। তাই এবার শুধু পুজো হচ্ছে। মেলা হবে না। আমার জন্মের পর প্রথম এইরকম পরিস্থিতি দেখলাম। সবাই সুস্থ থাকুক এই প্রার্থনা করি।’’
একসময় শুধুমাত্র রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ ভান্ডানী রূপে দেবীর আরাধনা করতেন। এখন ভান্ডানী পুজোকে ঘিরে উৎসবে মেতে ওঠেন অন্য সম্প্রদায়ের মানুষরাও। আলিপুরদুয়ারের পূর্ব ভোলারডাবড়ি, বাইরাগুড়ি সহ ডুয়ার্সের বেশ কিছু এলাকায় ভান্ডানী পুজো হয়। দেবী দুর্গার অন্য রূপ দেবী ভান্ডানীকে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের বনবস্তিবাসীরা ‘বনদুর্গা’ রূপে পুজো করেন।
আলিপুরদুয়ার শহর লাগোয়া পূর্ব ভোলার ডাবরি গ্রামে ভান্ডানী পুজো এবার ১১৬ বছরে পড়ল। গ্রামের বিএফপি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এই পুজো হচ্ছে। করোনার জন্য পুজো উপলক্ষে এবার মেলা বসেনি। মানুষের বিশ্বাস বাপের বাড়ি আরও একদিন অন্যরূপে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন মা দুর্গা। পুজো কমিটির সদস্য বীরেন্দ্র নাথ রায় বলেন, ‘‘আমাদের পূর্বপুরুষরা এই পুজোর পত্তন করেন। এই পুজোর সময় গ্রামের সবাই যে যেখানেই থাকুন বাড়িতে ফিরে আসেন। বিসর্জনের পর এখানে বোধন হয় ভান্ডানীর। মা ভান্ডানীর আশীর্বাদে শস্য শ্যামল হয়েছিল এই এলাকা। তাই ভান্ডানীকে ভক্তিভরে পুজো করেন গ্রামবাসীরা।’’