
শেষ আপডেট: 20 June 2020 10:26
যাঁদের আর্থিক সঙ্গতি তেমন নেই তাঁরা হয় গ্রামের উঁচু জায়গায় রাস্তার পাশে প্লাস্টিক ও তাঁবু টানিয়ে নিয়ে থাকছেন। কেউবা আবার নদীর জলে ডুবতে বসা যৎসামান্য ভিটেমাটি দালালদের কাছে জলের দরে বিক্রি করে পাকাপাকি আস্তানা করার চেষ্টা করছেন বারাসত বসিরহাটে।
হিঙ্গলগঞ্জের কালিতলা গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা তারক মণ্ডলের বাড়ি গ্রাস করেছে কালিন্দি নদী। স্ত্রী ও স্বজনদের নিয়ে দু’সপ্তাহ আগে তারকবাবু বসিরহাটের শোনপুকুরের ধারে ঘর ভাড়া নিয়েছেন। বললেন, ‘‘আর কীই বা করতাম। বাড়ি চলে গেছে নদীর গ্রাসে। কতদিন আর এখানে ওখানে মাথা গুঁজে থাকব? তাই বাধ্য হয়ে চলে এলাম এখানে।’’
অন্যের জমিতে খেতমজুরের কাজ করতেন জয়ন্ত বিশ্বাস। চাষের জমি জলের তলায় থাকায় কর্মহীন গত একমাস ধরে। মাটির বাড়ি তাও জলে ধুয়ে গেছে। পড়ে যাওয়া ঘরের শখানেক আস্ত টালি উদ্ধার করে গ্রামের রাস্তার ওপরেই একপাশে প্লাস্টিক ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করে নিয়েছেন অস্থায়ী ঘর। তিনি একা নন, উমফানের দাপটে অনেক মানুষের গৃহস্থালিই এখন রাস্তার উপর। ধেয়ে আসা নদীর দিকে তাকিয়ে স্বগতোক্তি করেন জয়ন্ত, ‘‘কোনওদিন কি মাথার উপর ছাদ হবে আর?’’
বছর ৫৫র দিপালী মজুমদার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে জয়ন্তবাবুর পাশেই তাঁবু খাটিয়ে ছিলেন। গত সোমবার তাঁর স্বর্গীয় স্বামীর ভিটেমাটি জলের দরে বিক্রি করে দেগঙ্গা ভাসিলা অঞ্চলে এক নিকটাত্মীয়ের বাড়ির পাশেই জমি কিনেছেন। দিপালী দেবীর মেয়ে অনন্যা বসিরহাট কলেজের কলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। মা করতেন সেলাইয়ের কাজ। অনন্যা টিউশন পড়ান। তাই দিয়েই কোনওমতে চলে সংসার। ‘‘এখন নতুন জায়গায় আবার নতুন লড়াই।’’ বলছেন অনন্যা।
সব হারিয়ে আত্মীয়ের গলগ্রহ হয়ে থাকার যন্ত্রণা সহ্য করছেন এমন বাসিন্দার সংখ্যাও কম নয়। কবে ভাঙা নদীর বাঁধ ঠিক হবে তা জানা নেই কারও। তাই গ্রামে বা ঘরে ফেরা অনিশ্চিত। ভবানীপুর, হাসনাবাদ, ন্যাজাট, বাউনিয়া, রূপমারি, স্যান্ডেলের বিল, দুর্গা মণ্ডপ, দুলদুলি, ভাণ্ডারখালি, যোগেশগঞ্জ, গোবিন্দকাটি, ডাকবাংলো, শামশেরনগর, কালিতলা, বামনিয়া, হেমনগর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের একটাই দাবি তৈরি করা হোক কংক্রিটের নদী বাঁধ। যা সুন্দরবনের আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করবে।
উমফানের পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাপের সঙ্গে সহাবস্থান করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু সাপের কামড় ও জলবাহিত নানা রোগ দেখা দেওয়ায় পেরে ওঠেননি। বাসিন্দারা বলছেন, ‘‘গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, ব্লক ও জেলা পরিষদ কোন স্তরেই অভাব অভিযোগ ও চরম দুর্দশার কথা বলে সমাধান পাইনি। রাজ্য সরকারের মাধ্যমে কেন্দ্রের দেওয়া আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের টাকাও মেলেনি এখনও। শান্তিতে থাকার মতো মাথা গোঁজার নিশ্চিন্ত আস্তানা নেই। কোনও সমাধান না পেয়ে তাই বিকল্প বাসস্থানের খোঁজে চোদ্দপুরুষের ভিটেমাটি ছাড়ছেন দলে দলে মানুষ।