দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: ফের চালু হলে মুইদিপুরের বালি খাদানে আগুন জ্বলবে বলে চরম হুঁশিয়ারি দিলেন গ্রামের মহিলারা। বাঁধের রাস্তা দিয়ে বালির লরি গেলে চালকরাও রেহাই পাবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিলেন মুইদিপুরের বাসিন্দারা। যা নিয়ে তুঙ্গে উঠেছে শাসক ও বিরোধীদের রাজনৈতিক তরজা।
মাইদিপুর গ্রামে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৯ টা নাগাদ বালি বোঝাই লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা মারে রাস্তার ধারে থাকা একটি মাটির বাড়িতে। প্রশান্ত বাউরি ও তাঁর ভাই সুশান্ত বাউরির পরিবার থাকতেন সেই বাড়িতে। ওভার লোড বালি বোঝাই লরি বাঁধের রাস্তা থেকে প্রশান্তর ঘরের উপরে উল্টো পড়ে। মাটির বাড়ির দেওয়াল ও লরি থেকে পড়ে যাওয়া বালির নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় প্রশান্তর স্ত্রী সন্ধ্যা বাউরি ও তাঁর ছেলে মেয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রাহুল ও নবম শ্রেণির পড়ুয়া রিঙ্কুর। দুর্ঘটনার সময়ে বাড়িতে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান প্রশান্ত।
এই দুর্ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পুলিশের উপরে জনরোষ আছড়ে পড়ে। রোষের আগুনে পোড়ে এলাকার বালি খাদানের দুটি অফিস ঘর এবং সেখানে থাকা বালি বোঝাই একটি লরি ও ট্র্যাক্টর। সে দিনই রাতারাতি রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ ও জেলা প্রশাসনে কর্তারা ক্ষতিপূরণের সাড়ে ছয় লক্ষ টাকার চেক প্রশান্ত বাউরির হাতে তুলে দেন।
প্রশান্ত জানিয়েছেন, “জেলা প্রশাসন ছাড়াও জামালপুর থানার পুলিশের কর্তাও তাঁর হাতে আট লক্ষ টাকা দিয়েছে। চোখের জল মুছতে মুছতে প্রশান্ত এদিন বলেন, ‘‘টাকা হয়তো কিছু মিলেছে। কিন্তু স্ত্রী আর সন্তানদের তো আর ফিরে পাব না। আমার বেঁচে থেকে কী লাভ!’’
প্রশাসন ও পুলিশ মৃতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের অর্থ যাই দিক, বালি খাদান আর চলতে না দেওয়ার ব্যাপারে কিন্তু এককাট্টা হয়েছেন মুইদিপুরের বাসিন্দারা। এদিন মুইদিপুর গ্রামের বধূ সুজাতা বাউরি, রেখা বাউরি, যশোদা বাউরিরা দাবি করেন খাদানটি অবৈধ ভাবে চলছিল। পুলিশ ও প্রশাসন সব জানার পরেও এতদিন ব্যবস্থা নেয়নি। তাঁরা বলেন , ‘‘ক্ষতিপূরণের নামে মৃতের পরিবারকে টাকা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করা যাবে না। মুইদিপুর গ্রামে চলা বালি খাদান বন্ধ করতেই হবে। পাশাপাশি গ্রামে বাঁধের রাস্তা দিয়ে বালির লরির যাতাযাতও বন্ধ করতে হবে। তা না করে বালি খাদান যদি ফের চালু হয় ও গ্রামের রাস্তা দিয়ে ফের যদি বালির লরি যাতায়াত করে তবে আবার খাদানে আগুন জ্বলবে।’’
প্রশান্ত বাউরির দিদি প্রতিমা বাউরি, “বালি খাদানের অফিস থেকেই বিক্রি হয় মদ সহ অন্য নেশার দ্রব্য। আর নেশা করেই লরির চালকরা ওভার লোড বালির লরি নিয়ে বাঁধের রাস্তা দিয়ে বেপরোয়া গতিতে যাতায়াত করে। ফের খাদান চালু হলে বাঁধের রাস্তার ধারে বসবাসকারী অন্য কারুর বাড়িতেও বালির লরি উল্টে পড়বে না তার কী গ্যারান্টি আছে?’’ তাই প্রশাসন যদি বালি খাদান চালু করতে চায় তবে বাঁধের রাস্তার ধারে বসবাস করা প্রত্যেকটি পরিবারের জন্য অন্য জায়গায় বাড়ি তৈরি করে দিতে হবে বলে দাবি করেছেন এলাকার মানুষ।।
গ্রামবাসীরা বালি খাদান নিয়ে ক্ষোভে ফুঁষলেও বেপাত্তা মুইদিপুরের বালি খাদানের মালিক সজল কোলে। তার গ্রামের বাড়ি জামালপুরের দ্বীপেরমানাতে হানা দিয়েও পুলিশ সজল কোলের নাগাল পায়নি।
এদিকে এই দুর্ঘটনা নিয়ে শাসক দল ও বিজেপি নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক তরজা এখন তুঙ্গে উঠেছে। এলাকার বিজেপির মণ্ডল সভাপতি অভিজিৎ ঘোষাল এদিন বলেন, “পুলিশ ও শাসক দলের মদতে অবৈধ বালি খাদানটি চলছিল। এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তার প্রতিবাদ জানিয়ে আসলেও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বালির লরি উল্টে একই পরিবারের তিন জনের মৃত্যুর পর টাকা দিয়ে পুলিশ এখন ঘটনার দায় এড়াতে চাইছে। সবাব মুখ বন্ধ করতে চাইছে।” জামালপুরের তৃণমূল নেতা তথা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মেহেমুদ খান বলেন, “মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করাটাই এখন বিজেপির নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসকদলের কেউ ওই খাদান চালাতো না। পুলিশ ও প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে। অবশ্যই সামনে আসবে মুইদিপুরে বালিখাদানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আসল পরিচয়।”