দ্য ওয়াল ব্যুরো, বোলপুর: বিশ্বভারতীর জমির পরিমাণ জানতে সুনির্দিষ্ট ভাবে জরিপের দাবিতে সরব হলেন সমাজকর্মী, পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত। বৃহস্পতিবার একটি সাংবাদিক বৈঠক করে সুভাষবাবু জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট জমির পরিমাণ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। কেননা তিনটে সময় তিন ধরণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই অবস্থায় বর্তমান প্রেক্ষিতে ঠিক কতটা জমি বিশ্বভারতীর রয়েছে তা না জানলে আগামীতে সমস্যা হবে কর্তৃপক্ষরই।
কিছুদিন আগেই নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেনের বিরুদ্ধে শান্তিনিকেতনে বেআইনিভাবে জমি দখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছিল। ঘুরপথে নয়, সরাসরি সাংবাদিক বৈঠক করে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছিলেন, বেআইনিভাবে জমি দখল করে রয়েছেন অমর্ত্য সেন। এই ঘটনা নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি বলে দেন, এসব বিজেপির চক্রান্ত। পরবর্তীকালে অমর্ত্য সেনকে লেখা মমতার চিঠি, কিংবা অমর্ত্য সেনের ফিরতি চিঠি, অথবা কলকাতায় বিশিষ্টজনদের মিছিল, জমি বিতর্কে সবই দেখা গিয়েছে। এ বার বিশ্বভারতীর জমি নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করলেন সুভাষ দত্ত।
এর আগে বিশ্বভারতীর বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে এনে পরিবেশ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন সুভাষ দত্ত। একজন পরিবেশবিদ হয়ে হঠাৎ করে বিশ্বভারতীর জমি নিয়ে পর্যালোচনা কেন? সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "পরিবেশবিদ হওয়ার আগে আমি একজন সমাজকর্মী। বিশ্বভারতী একটি ঐতিহ্যময় প্রতিষ্ঠান। জমি বিতর্ক নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেকে কথা বলছেন। তবে মূল জায়গায় কেউ যাচ্ছেন না। সেই মূল জায়গাটা ধরার জন্যই এই ব্যবস্থা।" এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ২২ জানুয়ারি বিশ্বভারতীর আচার্য তথা দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তবে কোনও পক্ষ থেকেই এখনও উত্তর পাননি। সুভাষবাবুর মত, আরও একবার বিষয়টি জানাবেন তিনি। তারপরও কোনও পদক্ষেপ না হলে শেষ পর্যন্ত আইনের দ্বারস্থ হবেন।
বিশ্বভারতীর জমির পরিমাণ নিয়ে যে বিভ্রান্তিকর তথ্য তিনি পেয়েছেন সেই বিষয়েও বিশদ আলোচনা করেন সাংবাদিক বৈঠকে। সুভাষবাবু জানান, ১৯২১ সালের ২২ ডিসেম্বর সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন এর দলিল অনুযায়ী জমির পরিমাণ ছিল ৪০০ বিঘা। ১৯৫১ সালের ৯ মে বিশ্বভারতী অ্যাক্টে উল্লেখিত জমির পরিমাণ ৩০০০ হেক্টর। ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিশ্বভারতীর উপাচার্য সংবাদমাধ্যমে যে বক্তব্য দেন সেখানে তিনি জানান বিশ্বভারতীর মোট জমির পরিমাণ ১১৩৮ একর। ১১৩৮ একর জমিকে হেক্টরে রূপান্তরিত করলে জমির পরিমাপ হয় প্রায় ৪৬১ হেক্টর। ১৯৫১ সালের ৩০০০ হেক্টর জমি ২০২০ সালে কী করে ৪৬১ হেক্টর হয়ে গেল অর্থাৎ বিশ্বভারতীর কাছে এই নিয়ে আদৌ কোনও পোক্ত তথ্য আছে কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সুভাষবাবু।
তাঁর মত, বিশ্বভারতী অ্যাক্টের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী ৩০০০ হেক্টর জমিকেই গ্রাহ্য করা উচিত বলে মনে করছেন তিনি। এই অবস্থায় বিশ্বভারতী আইনত কতটা জমির মালিক সেটা জানা দরকার। বর্তমানে কতটা জমির দলিল তাদের হাতে আছে সেটাও জানা জরুরি। ১৯২১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কত জমি কেনা হয়েছে, কত জমি দান হিসেবে পাওয়া গিয়েছে এবং কতটা অধিগ্রহণ করা হয়েছে সেটাও নির্ণয় করা দরকার। এমনকি বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ কতটা জমি দানপত্র করেছেন বা লিজ দিয়েছেন তার সম্পূর্ণ হিসাবটাও জানা জরুরি বলেই তাঁর মত। এদিন কার্যত বিশ্বভারতীর সঙ্গে সুর মিলিয়েই তিনি বলেন, "এটা দেখা দরকার যে জায়গা যেন বেহাত না হয়ে যায়।"
সুভাষবাবু জানান, বিশ্বভারতীর জমি নিয়ে তথ্য তোলার জন্য তিনি কথা বলেছেন ভূমি রাজস্ব আধিকারিকের সঙ্গে। তবে বিশ্বভারতীর সম্পত্তি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনও উত্তর পাননি। এই প্রসঙ্গে সুভাষবাবুর বক্তব্য, ‘‘বিশ্বভারতী তার নিজের জমির পরিমাপ করতে চাইছে সেটা কোনও ভুল নয়। কিন্তু যে পদ্ধতি ধরে করছে সেখানে ভুল থেকে যাচ্ছে। শুধুমাত্র অমর্ত্য সেন কেন, পরিমাপ করতে হলে প্রত্যেকটা জমি পরিমাপ করা প্রয়োজন। কারণ অনেকেই এরকম রয়েছেন যাঁরা ইচ্ছাকৃত কিংবা ভুলবশত বিশ্বভারতীর অতিরিক্ত জমি ব্যবহার করছেন। উপযুক্ত জরিপ হলে তবেই নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া যাবে তার আগে নয়।"
বিশ্বভারতীর এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘জমি পরিমাপে সহায়তার জন্য ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারকে জানানো হয়েছে। অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও বিশ্বভারতী নিচ্ছে। হঠাৎ করে পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত কেন বিশ্বভারতীর জমি নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করলেন! এতে তাঁর কী লাভ সেটা স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না।’’