দ্য ওয়াল ব্যুরো, মুর্শিদাবাদ: সিএএ বিরোধী বিক্ষোভে গুলি ও দু’জনের মৃত্যুর ঘটনায় এখনও উত্তপ্ত জলঙ্গি থানার সাহেবনগর গ্রাম। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের নাম আবুল কালাম বাশার, রফিকুল ইসলাম ও কনক শেখ।
গ্রামবাসীদের বক্তব্য, দোষীদের না ধরে আন্দোলনকারীদেরই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃত ব্যক্তিদের মুক্তি এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পথে নামে সাহেবনগর গ্রামের সাধারণ মানুষ ও মহিলারা। মৃত আনারুল বিশ্বাস (৬৫) ও সালাউদ্দিন শেখের (১৭) দেহ কবর না দিয়ে, সাগরপাড়া-রানিনগর রাজ্য সড়ক অবরোধ করে শুরু হয় বিক্ষোভ। তাদের বক্তব্য, তৃণমূলের স্থানীয় নেতা তহিরুদ্দিন মণ্ডলের নেতৃত্বেই এই ঘটনা ঘটেছে। তহিরুদ্দিন ও মিল্টন মণ্ডল-সহ যে ১৭জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে তাদের কাউকেই এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। যাঁদের ধরা হয়েছে তাঁরা কেউই এই ঘটনায় অভিযুক্ত নয়। তহিরউদ্দিন ও মিল্টনকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে বলেও দাবি এলাকার মানুষের। যতক্ষণ না তা হচ্ছে ততক্ষণ তাঁদের বিক্ষোভ চলবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় মানুষজনের দাবি, বুধবার রাতেও মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছিল তহিরুল। সকালে গ্রামে উত্তেজনা বাড়ছে খবর পেয়েই গা ঢাকা দেয়। পুলিশ অবশ্য এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করেনি। উত্তেজনা থাকায় এখনও এলাকায় রয়েছেন ডিআইজি নদিয়া-মুর্শিদাবাদ রেঞ্জ শ্রীমুকেশ ও মুর্শিদাবাদের এসপি অজিত সিং যাদব।
বুধবার সকালে সাহেবনগরে সিএএ বিরোধী বিক্ষোভে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। এখনও পর্যন্ত এক নাবালক-সহ দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন তিন জন। ঘটনার পরে বিক্ষুব্ধ জনতা একটি মারুতি ভ্যানে ভাঙচুর করে ও একটি মোটরবাইকে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের ডাকা সিএএ-এনআরসি বিরোধী বনধ ঘিরে ঘটনার সূত্রপাত। বনধ পালন করছিলেন ভারতের গণতান্ত্রিক নাগরিক মঞ্চ। সিএএ, এনআরসি এবং এনপিআরের বিরুদ্ধে গত ২০ ডিসেম্বর এই মঞ্চটি তৈরি হয়। সাহেবনগর বাজারের কাছে এই মঞ্চের জনা ষাটেক লোক মিছিল করে আসছিলেন। তখনই কয়েকটি মারুতি ভ্যান থেকে এলোপাথাড়ি গুলি চালানো শুরু হয় বলে অভিযোগ। তৃণমূলের স্থানীয় নেতা তহিরুদ্দিন মণ্ডলের নেতৃত্বেই এই ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
মিছিলে থাকা আব্দুল জব্বার বলেন, “বুদ্ধিজীবী, নাগরিক ও দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন মানুষকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ভারতের গণতান্ত্রিক নাগরিক মঞ্চ। এদিন মুসলিম পার্সোন্যাল ল বোর্ডের ডাকা ভারত বন্ধ পালন করছিলাম জলঙ্গিতে। সাহেবগঞ্জ বাজারের কাছে আমরা মিছিল করে আসছিলাম। সেই সময় জলঙ্গি ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের উত্তর জোনের সভাপতি তহিরুদ্দিন মণ্ডল এবং সাহেবনগর গ্রামপঞ্চায়েতের প্রধানের স্বামী আখতারুজ্জামান মিল্টনের নেতৃত্বে জনা পঞ্চাশেক লোক আমাদের মিছিলের উপরে গুলি, বোমা, সকেটবোমা প্রভৃতি নিয়ে আক্রমণ করে। আমরা তখন ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাই। জলঙ্গি ব্লক এলাকার খয়রামারি কাঁটাবাড়ি প্রভৃতি এলাকার যত দুষ্কৃতী আছে তাদের নিয়ে এই আক্রমণ হয়।”
তৃণমূলের অভিযোগ, তারা গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে রাস্তা ছাড়েনি ওই মিছিল। আগে মিছিল থেকে তাদের উপরে আক্রমণ করা হয়। উত্তরে জব্বার বলেন, “প্রথমত আমাদের বিরুদ্ধে আনা হামলার অভিযোগ মিথ্যে। দ্বিতীয়ত বেশ কয়েকটি মারুতি গাড়িতে পিস্তল-বোমা-সকেটবোমা নিয়ে ওরা ঘুরছিল কেন!”
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস কোনও ভাবে জানতে পারে বুধবার জলঙ্গিতে যে মিছিল ও বনধ পালন করা হবে তার নেপথ্যে রয়েছে আসাদুদ্দিন ওয়াইসির দল মজলিস-ই-মুত্তেহাদিন মুসলিমিন বা মিম। এতে সায় ছিল না তৃণমূলের। তারা চাইছিল এরাজ্যে সিএএ বিরোধী আন্দোলন ও বিক্ষোভ হবে শুধুমাত্র তাদের নেতৃত্বে। তৃণমূলের নিষেধ না শুনে বুধবার সকালে সাহেবনগরে সিএএ বিরোধী বিক্ষোভ ও মিছিল শুরু হয়, পথ অবরোধ করা হয়। তাতেই তারা খেপে যায়।
জেলা তৃণমূল সভাপতি তথা মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান অবশ্য বুধবারই দাবি করেন এই ঘটনায় তৃণমূলের কেউ জড়িত নয়।