দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: কেটে গেল একুশ শতকেরও বেশ খানিকটা সময়। মনের আঁধার কাটল না তবুও। আউশগ্রাম ১ ব্লকের বড়া গ্রামের সবিতা ঘোষের বন্দিজীবন তারই প্রমাণ। মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় মানুষটিকে গত ১৬ বছর ধরে বন্দি করে রেখেছেন তাঁর স্বজনরা। অভিযোগ, খাবার আর জলটুকুও পান না ঠিকমতো। শুধু বৈমাত্রেয় বোন তাঁকে দুবেলা দুমুঠো দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন কোনওমতে।
দিনে দুবার জানালার ফাঁক দিয়ে কিছু খাবার দেওয়া হয়। সঙ্গে এক বোতল জল। তীব্র শীতের সময়েও জোটেনি একটা কম্বল। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেও ভরসা অন্ধকারময় এই ঘরটাই। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এমন জীবন কাটাতে হচ্ছে মানসিক ভারসাম্যহীন চল্লিশ ছুঁইছুঁই মহিলাকে। মাঝেমধ্যেই মুক্তির জন্য আর্ত চিৎকার করে ওঠেন তিনি। কিন্তু কে শোনে তাঁর কথা।
বহু বছর আগেই মাকে হারিয়েছেন সবিতা। বাবা শিবপ্রসাদ ঘোষও মারা গিয়েছেন কয়েকবছর আগে। শিবপ্রসাদবাবু দুবার বিয়ে করেছেন। তার প্রথমপক্ষের এক ছেলে দুই মেয়ে। তাদের মধ্যে ছোট মেয়ে সবিতা। দ্বিতীয়পক্ষের মেয়ে কাবেরী মণ্ডলের বিয়ে হয়েছে বড়া গ্রামেই।
পৈত্রিক বাড়িতেই সবিতা বন্দি। বাড়িতে রয়েছেন দাদা, বৌদি ও দাদার এক মেয়ে। প্রতিবেশীরা জানান, দাদা উজ্জ্বল ঘোষ একই বাড়িতে থাকলেও খেতে পর্যন্ত দেন না বোনকে। সবিতার বৈমাত্রেয় বোন কাবেরী নিয়ম করে দুবার খাবার দিয়ে যান জানালা দিয়ে।
কাবেরীদেবী বলেন, ‘‘দিদি পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভালো নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করেন। তারপর কোনও এক অজানা কারণে মানসিক ভারসাম্য হারান। তারপর থেকে দাদা ঘরে আটকে রেখে দিয়েছে। ঘরের চাবি দাদার কাছেই থাকে। সেভাবে দিদির চিকিৎসা করাও হয়নি।’’
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে সবিতার দাদা উজ্জ্বল ঘোষ সম্পন্ন চাষি হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। পৈতৃক জমিজমা রয়েছে বেশ কিছুটা। কাবেরীর স্বামী মনোজ মণ্ডলের ক্ষোভ, ‘‘একজন মানুষকে অমানুষিকভাবে বছরের পর বছর গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা করালে হয়তো সুস্থ জীবন পেতেন। আমার স্ত্রী তাঁর দিদিকে খাবার দিতে যান। আমি তাতে আপত্তি করি না। কিন্তু আমার বিয়ের পর থেকে কোনওদিন দেখলাম না আমার অসুস্থ শ্যালিকার চিকিৎসা করানো হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। তাই কিছু বলতেও পারি না।’’
কিন্তু কেন এভাবে বন্দি করে রাখা হয়েছে সবিতাকে। উজ্জ্বলবাবুকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী চম্পার দাবি, ‘‘মাথাখারাপ হওয়ার পর সবিতা কয়েকবার বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তাই আটকে রাখার জন্য ঘরে রেখে দেওয়া হয়েছে।’’ এর বেশি আর কিছু বলতে চাননি তিনি।
আউশগ্রাম ১ বিডিও অরিন্দম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বিষয়টি জানা নেই। যদি গ্রাম থেকে কেউ জানান তাহলে ওই মহিলাকে উদ্ধার করে হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’’ গ্রামের মানুষ এই অমানবিক ব্যাপারটা ষোলো বছর ধরে দেখে আসছেন। সবিতার বোন আর ভগ্নিপতিও এই অবস্থা থেকে মুক্তি চান। এখন প্রশ্ন নরকযন্ত্রণার এই জীবন থেকে সবিতার মুক্তি আর কত দূরে?