দ্য ওয়াল ব্যুরো, পুরুলিয়া: ঘর ফিরতি ছয় শ্রমিকের মৃতদেহ এল পুরুলিয়ায়। সোমবার সকাল ১১ টায় পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো সদর হাসপাতাল ও পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় তাঁদের দেহ। সেখানে তৈরি রাখা হয়েছিল তিনটি অ্যাম্বুল্যান্স। এই তিনটি অ্যাম্বুল্যান্সে করে মৃতদেহগুলি জেলার বিভিন্ন প্রান্তে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
শুক্রবার রাত তিনটে নাগাদ উত্তরপ্রদেশের আউড়িয়াতে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান ২৪ জন শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে ছ’জন পুরুলিয়ার বাসিন্দা। কোটশিলা থানার উপরবাটরি গ্রামের তিনজন শ্রমিক এই দুর্ঘটনায় মারা যান। জয়পুর থানার ঝাল মামড়া গ্রামের বাসিন্দা একজনের মৃত্যু হয়। মৃত অন্য দু’জনের বাড়ি পুরুলিয়ার মফস্বল থানার দুমদুমি গ্রামে। মৃতদেহের সঙ্গেই এদিন নিয়ে আসা হয় ওই দুর্ঘটনায় আহত জেলার তিন শ্রমিককেও। এরা হলেন পুরুলিয়া মফস্বল থানার বোঙ্গাবাড়ি গ্রামের শিবরাম কর্মকার, পাড়া থানার ভাউরিডি গ্রামের কৈলাস মাহাতো এবং কোটশিলা থানার উপরবাটরি গ্রামের গোপাল মাহাত। এঁদের দু’জনকে পুরুলিয়া সদর হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
মৃতদেহের সঙ্গে আসা আহত শ্রমিকদের অভিযোগ, উত্তরপ্রদেশ সরকার মৃতদেহের সঙ্গে একই লরিতে তাঁদের তুলে দেয়। মৃতদেহ পচন ধরে যাওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। ফলে তাঁদের বমি হতে থাকে। শরীর খারাপ হয়ে যায়। এই অমানবিক ঘটনার কথা তাঁরা জানান এ দিন সদর হাসপাতালে উপস্থিত জেলা স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের।
দুমদুমি গ্রামের বাসিন্দা ২৮ বছরের যুবক চন্দন রাজোয়ার কলেজে পড়তে পড়তেই অভাবের তাড়নায় পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখানে কাজ জোটেনি। তাই বাবা-মা ভাই-বোনের পেট চালাতে চলে গেছিলেন রাজস্থানে মার্বেল পাথরের কাজ করতে। লকডাউনের জেরে জেরবার হয়ে ঘরে ফেরার পথ ধরেছিলেন চন্দন। কিন্তু ফেরা হল না। এদিন গ্রামে তাঁর দেহ আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের লোক। বাড়িতে না নামিয়ে সোজা গ্রামের শ্মশান ধবিয়াবেরা জোড়ে নিয়ে যাওয়া হয় দেহ। সেখানেই তাঁর সৎকার করা হয়।
বছর চল্লিশের অজিত মাহাতো। দিনমজুরের কাজ করতেন। আয় কমে যাওয়ায় এ বছরের জানুয়ারি মাসে মার্বেল পাথরের কাজ করতে গিয়েছিলেন রাজস্থানে। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আরেক মেয়ের বিয়ের কথাবার্তাও চলছিল। তিন মেয়ে ও এক ছেলে তাঁর। এ দিন কোটশিলা থানার উপরবাটরি গ্রামে ফিরল তাঁর দেহ।
কাজের সন্ধানে দুমদুমি গ্রামের বাসিন্দা মিলন বাদ্যকার ও তাঁর ভাই দেবাশিসও গিয়েছিল রাজস্থানে। পৌষ মাসে বাড়ি ফেরার পর বাবার শরীর খারাপ হওয়ায় আর ফিরে যাননি দেবাশিস। গিয়েছিলেন মিলন। তাঁরও দেহ ফিরল এ দিন।
মৃত আরেক পরিযায়ী শ্রমিক গণেশ রাজোয়ারের (২০) বাড়ি জয়পুরের ঝালমামরো গ্রামে। কিন্তু তিনি পুরুলিয়া মফস্বল থানার বোঙ্গাবারিতে মামাবাড়িতে থাকতেন। সেখানে থেকে রাজস্থানে মার্বেল পাথরের কারখানায় কাজ করতে গেছিলেন। বাড়িতে বাবা-মা এবং তিন ভাই রয়েছে তাঁর। দুর্ঘটনার খবর আসার পর থেকেই শোকে মুহ্যমান গোটা পরিবার। আজ দেহ ফিরতেই বাঁধ ভাঙল চোখের জলের।