দ্য ওয়াল ব্যুরো, বোলপুর: করোনা পরিস্থিতি আর তার হাত ধরে আসা লকডাউনে গতবছরের মার্চ মাসে তালা ঝুলেছিল স্কুলের দরজায়। সেই অবসরে নিজেদের মতো করে খেলার মাঠকে আঁকড়ে ধরেছিল গ্রামের বহু পড়ুয়া। স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিনে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা অনুশীলন, আর মাঠে নেমে কিছু করে দেখানোর জেদই সাফল্য এনে দিল বীরভূমের গ্রামীণ এলাকার বাহিরী ব্রজসুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ফুটবল দলকে। মালদহের জয়েনপুরে অনুষ্ঠিত আটদলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টে হলদিবাড়ি, বালুরঘাট এবং কলকাতার টিমকে হারিয়ে জিতে ফিরে এসেছে তারা। দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের পিঙ্কি, সুপর্ণা, সুরঞ্জনা, পূজাদের ভবিষ্যৎ কী? সাফল্য আসতেই ঘুরছে সেই প্রশ্ন। চোখে স্বপ্ন, মনে জোর আছে, কিন্তু খেলতে গেলে প্রোটিনসমৃদ্ধ যে খাদ্যদ্রব্যের প্রয়োজন, তার যোগান কই। সেই ভাবনায় ডুবে প্রশিক্ষক এবং অভিভাবকরা।
মানব মিলন স্বেচ্ছাসেবী সমিতির ব্যবস্থাপনায় মালদহ জেলার জয়েনপুরে সম্প্রতি আরবিএনএনএ সংহতি কাপের আসর বসেছিল। আটদলীয় এই ফুটবল টুর্নামেন্টে রাজ্যের ছ'টি জেলা এবং পড়শি রাজ্য বিহারের দুটি জেলার মহিলা ফুটবল দল অংশ নেয়। বাহিরী ব্রজসুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা বীরভূম জেলার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে। ১৫ জনের দলকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন ফুটবল প্রশিক্ষক মলয়কুমার সেন। তিনি জানান, প্রথমে হলদিবাড়ির সঙ্গে খেলায় ২-১ গোলে জিতে যায় মেয়েরা। বালুরঘাটের দলের সঙ্গে দ্বিতীয় খেলায় নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ফল অমীমাংসিত থাকলেও ট্রাই ব্রেকারে বালুরঘাট পরাজিত হয়। ফাইনালে কলকাতার দলের সঙ্গে খেলায় ২-১ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় স্কুলের ছাত্রীরা। তিনটি খেলাতেই গোল করে 'ম্যান অফ দ্য সিরিজ' হয়েছে দশম শ্রেণির ছাত্রী সুরঞ্জনা লোহার। ফাইনাল খেলায় সেরা গোলকিপার হয়েছে স্কুলের ছাত্রী পূজা দাস।
ছাত্রীদের অভিভাবকদের মুখে এখন স্বপ্নজয়ের আনন্দ। তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে আগামীর ভাবনার কথা। তাঁরা জানাচ্ছেন, লকডাউনে তাঁদের কর্মস্থলগুলিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ঠিকমতো আয় না থাকায় মেয়েদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার এনে দিতে পারেন না। সাধারণ খাওয়া-দাওয়া করেই শরীরচর্চা, অনুশীলন করতে হচ্ছে। এভাবে কতদিন চলবে ভাবছেন তাঁরা। প্রশিক্ষক মলয়কুমার সেনের কথায়, ‘‘ছাত্রীরা স্কুলের সহযোগিতা সবসময় পান। স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক প্রদীপকুমার মণ্ডল ছাত্রী ফুটবল দলের জন্য যে চারাগাছ রোপণ করে গেছিলেন সেটাই এখন ফল দিচ্ছে। বর্তমান প্রধান শিক্ষক অমিতাভ কোনারও আরও এগিয়ে যেতে ছাত্রীদের উৎসাহ দিচ্ছেন। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রীরা এখন বর্তমানদের প্রশিক্ষণ দেয়। শুধু কিছুটা সরকারী সহযোগিতা পেলেই আরও অনেকটা এগিয়ে যাব আমরা।"
ছাত্রীরাও চায় এই প্রতিবন্ধকতার সঙ্গেও যুঝেই নিজেদের জায়গাটা করে নিতে। কোনি'-র গল্প শুনেছে তারা। মাঠে নামলেই সেই ‘ফাইট’ ধ্বনি ভেসে আসে কানে। ‘‘এমনভাবে জিতে স্কুলের মান, জেলার মান রাখব আমরা। আমাদের স্যারের কথা শুনেই।’’ একযোগে বলছে বাহিরী ব্রজসুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়ের জয়ী ছাত্রীরা।