
শেষ আপডেট: 8 November 2022 09:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অনেকে বলেন, দুর্নীতি কখনও অযোগ্য, অকর্মণ্যদের দিয়ে হয় না। তার জন্যও পাকা মাথা চাই। স্কুল সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি কর্মী নিয়োগ (SSC Recruitment Corruption) নিয়ে সিবিআই (CBI) আদালতে যে চার্জশিট পেশ করেছে, তার পরতে পরতে যেন সেই গল্পই বলা হয়েছে। সিবিআইয়ের তদন্ত যদি সঠিক হয়, তা হলে বুঝতে হবে সত্তর ছুঁইছুঁই কয়েকজন বৃদ্ধ মিলে সরকারি স্কুলের চাকরির নিয়োগপত্র অসামান্য নৈপুণ্যের সঙ্গে অযোগ্য, অকৃতকার্যদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
কীসের বিনিময়ে তা তাঁরা করেছিলেন? সিবিআই চার্জশিটে তা স্পষ্ট লেখা নেই। তবে এর উত্তর কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট আগেই দিয়ে রেখেছে। পার্থ বান্ধবী অর্পিতার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার রাশি রাশি টাকা, তাঁদের অগাধ সম্পদ ও সম্পত্তির উৎস এই সব চাকরি বিক্রিরই বলে অভিযোগ ইডির।
তবে এসবের থেকে রোমহর্ষক হল, গোটা গল্পটা! যে গল্পের গোড়ার কথা জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে বেশ কয়েক বছর আগে। বস্তুত শিল্প দফতর থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরানোর পর থেকেই তিনি (পার্থ) বেশ হতাশ ছিলেন। ঘরোয়া আলোচনায় পার্থ বহু সময়ে তা বলেও ফেলতেন। ববি হাকিম, অরূপ বিশ্বাসরা তখন তুলনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মন্ত্রী।
এ হেন শিক্ষমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানেই ২০১৬ সালে সরকারি স্কুলে অশিক্ষক করণিক তথা গ্রুপ-সি এবং পিওন, মেট্রন ইত্যাদি তথা গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছিল। তখন স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সুবীরেশ ভট্টাচার্য। সিবিআই আদালতকে জানিয়েছে, এই সুবীরেশের হাতেই প্রথম অনিয়মের সূত্রপাত ঘটে। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, লিখিত পরীক্ষার উত্তর ওএমআর শিটে দিতে হবে। সেই শিট কম্পিউটারে পরীক্ষা করা হবে। সুতরাং কোনও রিভিউ করার সুযোগ থাকবে না। প্রাথমিক ভাবে জানানো হয়েছিল যে ২০১৭টি শূন্য পদ রয়েছে।
কিন্তু শেষমেশ ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর ২০৩৫ জনের প্যানেল তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল, কোনও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। শুধু তা নয়, সুবীরেশের নেতৃত্বে কমিশন তাদের ওয়েবসাইটেও পূর্ণাঙ্গ লিস্ট দেয়নি। রিজিওনাল স্কুল সার্ভিস সেন্টারগুলোকেও কোনও তালিকা পাঠানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছিল, রোল নম্বর দিয়ে ওয়েবসাইটে চেক করলেই বোঝা যাবে প্রার্থী কৃতকার্য হয়েছে না অকৃতকার্য হয়েছে।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, এ ভাবে কিছু যোগ্য প্রার্থী নিয়োগপত্র দেওয়া হলেও, ভুয়ো নিয়োগের পরিসর রেখে দেন সুবীরেশ। ইতিমধ্যে শান্তিপ্রসাদ সিনহাকে স্কুল সার্ভিসের উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ করে পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এর পরই শুরু হয় আসল খেলা। ওএমআর শিট রিভিউ-র নামে আরটিআই আবেদন নিতে শুরু করে কমিশন। সিবিআই জানতে পেরেছে, বেশ কিছু লোক এই সব আবেদন জমা দিতে আসতেন। তাঁদের সঙ্গে শান্তিপ্রসাদের যোগাযোগ ছিল। পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ওএমআর শিট রিভিউ করা হবে না। কিন্তু তার পরেও আরটিআই আবেদনের নামে ওএমআর শিট রিভিউ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। আর তার মাধ্যমে প্যানেলে ঢোকানো হয় ৩৮১ জনকে। এদের মধ্যে সরাসরি পার্থর কিছু সুপারিশও ছিল বলে সিবিআইয়ের দাবি।
এর পর রিজিওনাল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানদের আসন সই স্ক্যান করে নিয়োগের জন্য সুপারিশপত্র তৈরি করা হয়। তার বিন্দুবিসর্গও জানতেন না রিজিওনাল চেয়ারম্যানরা। তার পর একই ভাবে জাল নিয়োগপত্র তৈরি করে স্কুল শিক্ষা পর্ষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়কে পাঠানো হয়। কল্যাণময়ের মাধ্যমে অযোগ্য, অকৃতকার্য ৩৮১ জন প্রার্থী চাকরি পান।
ঘটনা হল, স্কুল শিক্ষা বোর্ডের অ্যাডহক কমিটির প্রেসিডেন্ট পদে কল্যাণময়কেও নিয়মবহির্ভূত ভাবে বসিয়ে রাখা হয়েছিল বলে সিবিআই আদালতকে জানিয়েছে। ২০২১ সালে কল্যাণময়ের বয়স হয়ে গিয়েছিল ৬৮ বছর। তার পরেও তাঁর মেয়াদ এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়।
সিবিআই চার্জশিটে জানিয়েছে, রিজিওনাল সার্ভিস কমিশন থেকে শূন্যপদের তালিকা সংগ্রহ করেছিলেন শান্তিপ্রসাদ সিনহা। এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন কমিশনের আরেক কর্তা। তাঁর নাম সমরজিৎ আচার্য। কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি অভিযোগপত্রে আরও জানিয়েছে, এই শান্তিপ্রসাদই ভুয়ো নিয়োগপত্রগুলো তৈরি করেছিলেন। তার পর সেগুলো তিনি নিজে কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেন। শুধু তাই নয়, সিবিআইয়ের অভিযোগ কমিশনের কাছে থাকা তথ্য নষ্ট করার নেপথ্যেও ছিল এই বৃদ্ধ পাকা মাথা। তথ্য ও প্রমাণ লোপাটের জন্য তাঁর নির্দেশেই ওএমআরশিট ইভ্যালিউশেন ডেটা, সুপারিশ পত্র, সিডি ধ্বংস করা হয়।
সুবীরেশের পর কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন অধ্যাপক সৌমিত্র সরকার। গোটা ষড়যন্ত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়েও সবিস্তারে জানিয়েছে সিবিআই। কীভাবে আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলি থেকে তিনি তথ্য আনিয়েছিলেন তা চার্জশিটে লেখা রয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি আরও জানিয়েছে, এই সব কাজে সুবীরেশ ভট্টাচার্য, শান্তিপ্রসাদ সিনহা ও সৌমিত্র সরকারের সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করেছিলেন তৎকালীন কমিশনের সচিব অশোক কুমার সাহা।
স্কুল সার্ভিসের মাধ্যমে যখন এই সব নিয়োগ দুর্নীতি চলছে তখন শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ওএসডি ছিলেন প্রবীর বন্দ্যোপাধ্যায়। সিবিআই চার্জশিটে জানিয়েছে, প্রবীর ছিলেন কমিশন ও পার্থর মাঝে সেতুবন্ধ রামেশ্বর! তিনিই সমস্ত ফাইল পার্থকে পৌঁছে দিতেন। আবার পার্থ সুপারিশ জানাতেন শান্তিপ্রসাদদের। ষড়যন্ত্রের শিখরে বসে সবটা মনিটর করতেন পার্থই। আর দুর্নীতির কাজ চালিয়ে যেত কতগুলো বৃদ্ধ উর্বর মস্তিষ্ক।
অনুব্রত বাম্পার: একবার নয়, বাপ-বেটিতে মিলে চারবার লটারি জিতেছে, তদন্তে জেনেছে সিবিআই