দ্য ওয়াল ব্যুরো: নাম বদলে ও ডেরা পাল্টে এতদিন গা ঢাকা দিয়ে ছিল। কিন্তু শেষরক্ষা আর হল না। জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ তথা জেমবি-র অন্যতম শীর্ষ নেতা আবদুল করিমকে মুর্শিদাবাদ থেকে পাকড়াও করল কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। জঙ্গিপুর জেলা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে সুতি থানার কাশিমনগর এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে আবদুল করিম তথা বড় করিমকে।
কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে, জেমএমবি-র শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একজন এই বড় করিম। জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়া, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা থেকে সংগঠনের অর্থ জোগাড় করার মতো নানা গুরুদায়িত্ব ছিল এই করিমের কাঁধেই। গত এক বছর ধরে তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল পুলিশ। নানা রাজ্যে ডেরা পাল্টে ও নাম পাল্টে এতদিন গা ঢাকা দিয়েছিল করিম। গোয়েন্দা সূত্রে খবর এসেছিল, সম্প্রতি মুর্শিদাবাদেই আত্মগোপন করে রয়েছে সে। গতকাল রাতে জঙ্গিপুর পুলিশের সঙ্গে অভিযান চালায় কলকাতা পুলিশের এসটিএফ। ধরা পড়ে করিম। পুলিশ জানিয়েছে, ইদানীংকালেই সুতি ও সামশেরগঞ্জের নানা এলাকায় ডেরা পাল্টে পাল্টে থাকছিল করিম। তবে পুলিশের হাত থেকে আর পালাতে পারেনি। আজ তাকে আদালতে তোলা হবে।

সামশেরগঞ্জ থানার চাঁদনিদহ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল করিম তথা বড় করিম। জেএমবি মাথা সালাউদ্দিন সালেহিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ট। এসটিএফের ডেপুটি কমিশনার অপরাজিতা রাই জানিয়েছেন, ২০১৮ সালে করিমকে পাকড়াও করতে তার সামশেরগঞ্জের বাড়িতে আচমকা হানা দিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু তার নাগাল মেলেনি। কোনওভাবে খবর পেয়ে পুলিশ পৌঁছনোর আগেই পিঠটান দিয়েছিল করিম। তবে তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রচুর পরিমাণে বিস্ফোরক, আগ্নেয়াস্ত্র ও জিহাদের নানা জিনিসপত্র উদ্ধার হয়।
সালাউদ্দিন সালেহিন
এসটিএফ জানিয়েছে, জেএমবি-র মাথা সালেউদ্দিন সালেহিনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে করিম। ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশেই ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ জঙ্গির তালিকায় নাম রয়েছে সালাউদ্দিনের। বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, সেখানেও জেএমবি-র সহচেয়ে সক্রিয় জঙ্গি নেতাদের তালিকায় প্রথম সারিতেই রয়েছে বড় করিমের নাম। দুই দেশের সংগঠনের সঙ্গেই সমন্বয় রেখে চলে করিম। এমনকি গোয়েন্দা সূত্র এও জানাচ্ছে, বাংলাদেশের জেএমবি গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠকও চলে করিমের।
২০১৪ সালে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর থেকেই গোয়েন্দাদের হিট লিস্টে রয়েছে সালাউদ্দিন। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-র একটি সূত্রের দাবি, এই সালাউদ্দিন সালেহিনই এখন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ তথা জেএমবি-র আমির বা সর্বময় প্রধান। ২০১৬ সালে জেএমবি-র যে ছ’জন পাণ্ডা কলকাতা পুলিশের এসটিএফের জালে ধরা পড়ে তাদের থেকে জেরা করে সালাউদ্দিনের বেঙ্গালুরুর একটি ডেরার খোঁজ মিলেছিল। গোয়েন্দাদের অনুমান দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে নাম ও ডেরা পাল্টে দীর্ঘদিন গা ঢাকা দিয়েছিল সালাউদ্দিন। তাদের কার্যকলাপ বাংলাদেশে শুরু হয় বলে গোড়ায় সংগঠনের নাম ছিল ‘জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ’ বা জেএমবি। পরবর্তী কালে ভারতে সংগঠনের শাখা তৈরি হয় জেএমআই বা ‘জামাতুল মুজাহিদিন ইন্ডিয়া’ নাম দিয়ে।
গোয়েন্দাদের দাবি, খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডের পরে পুরনো মডেল ভেঙে দিয়ে নতুন সদস্যদের নিয়ে ধুলিয়ান মডেল তৈরি করে সালাউদ্দিন। এই ধুলিয়ান মডেলের অন্যতম তত্ত্বাবধায়ক ছিল এই বড় করিম। বুদ্ধগয়ায় বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য এই ধুলিয়ান মডেলকেই ব্যবহার করা হয়।
কওসর ওরফে জাহিদুল ইসলাম।
২০১৮ সালের অগস্টে বেঙ্গালুরু থেকে এনআইএ-র গোয়েন্দারা গ্রেফতার করেন বর্ধমান বিস্ফোরণ এবং বোধগয়া হামলার অন্যতম প্রধান চক্রী কওসরকে। পরে কলকাতা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কওসরের আরও বেশ কয়েক জন সঙ্গী। তারা কওসর গ্রেফতার হওয়ার পর জেএমবি-র ভারতীয় শাখার সংগঠন তথা ‘জামাতুল মুজাহিদিন ইন্ডিয়া’কে আরও শক্তিশালী করেছিল। এই কওসর জেরায় জানিয়েছিল, দেশীয় প্রযুক্তিতে রকেট প্রপেলড গান বা আরপিজি দিয়ে তারা ভারতে বড়সড় হামলার ছক কষেছিল। টার্গেট ছিল সিকিমের কয়েকটি বৌদ্ধ গুহা এবং উত্তর বাংলার কয়েকটি জায়গা। খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের পরই দক্ষিণ ভারতে গা ঢাকা দেয় কওসর এবং তার সঙ্গীরা। সেখান থেকে ডেরা বদলাতে শুরু করে। কাদুগোড়ি, কেআর পুরম, বেঙ্গালুরু-সহ একাধিক ডেরার হদিশ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। সেখান থেকে আইইডি তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার হয়েছে।
ভারতে জাল বিস্তারের নানা ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে জেএমবি সংগঠন এমন তথ্য আগেই দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। এনআইএ জানিয়েছে, বিহার, মহারাষ্ট্র, কেরল, কর্নাটকে জেএমবি জঙ্গিদের কার্যকলাপ বহুগুণ বেড়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের অ্যান্টি টেরর স্কোয়াড (এটিএস) এবং স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এর প্রধানদের এ বিষয়ে সতর্কও করেছে এনআইএ। গোয়েন্দাদের দাবি, এখন তাদের সংগঠন আরও কয়েকটি দেশেও ছড়িয়ে গেছে। মূল সংগঠনের নাম বদলে হয়েছে জেএম।