দ্য ওয়াল ব্যুরো: এত দিন তবু একটুআধটু আবরণ ছিল। কিন্তু সেসবের আর নামমাত্র রইল না। এ বার একেবারে খুল্লমখুল্লা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভার সদ্য প্রাক্তন তথা কলকাতার মেয়র (বুধবার রাত পর্যন্ত) শোভন চট্টোপাধ্যায় আর তাঁর স্ত্রী (এখনও আইনত) রত্না চট্টোপাধ্যায়ের দাম্পত্য কলহ অনেকদিন আগেই বেডরুমের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ দিন একটি টিভি চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে তা নেমে এল একেবারে নর্দমার পাশে। দুজনেই দুজনের বিরুদ্ধে যা সব অভিযোগ তুললেন তা সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। বঙ্গরাজনীতির খোঁজ খবর রাখা অনেকেই মনে করতে পারছেন না, কবে কোন রাজনৈতিক নেতার সাংসারিক অশান্তি এইরকম আগ্নেয়গিরির আকার নিয়েছিল।
অনেক জল্পনার পর মঙ্গলবারেই মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন শোভন। দিদি বলে দিয়েছিলেন, মেয়র পদও ছাড়তে। কিন্তু বুধবার পর্যন্ত মহানাগরিকের পদ ছাড়েননি তিনি। সন্ধ্যায় একটি বৈদ্যুতিন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শোভন একাধিক অভিযোগ আনলেন স্ত্রী রত্নার বিরুদ্ধে।
শোভনবাবুর সঙ্গে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক নিয়ে গত এক বছর ধরেই নানান রসালো গল্প রাজনৈতিক মহলে চালু রয়েছে। এর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের মামলাও রুজু করেছেন তিনি। কিন্তু এ দিন শোভনবাবু বৈশাখীকে 'শুভানুধ্যায়ী' আখ্যা দিয়ে বলেন, তাঁর সংসার ভাঙার জন্য দায়ী চিকু। সেই সঙ্গে শোভনের অভিযোগ, বৈশাখী এবং ওঁর মেয়েকে মারতে রত্না সুপারি কিলার লাগিয়েছিলেন। তাঁকে মারতে, সন্তানদের হাত দিয়ে জন্মদিনের কেকে বিষ মিশিয়ে পাঠানোরও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কলকাতা পুলিশ সব জানে বলেও দাবি করেন শোভন।
কে এই চিকু?
শোভনবাবু ওই সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি রাজনীতি করার কারণে সংসারে সময়ই দিতে পারতেন না। নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্য সম্পত্তির হিসেব নির্বাচন কমিশনকে দিতে হয়। শুধু নিজের নয়। স্ত্রীর সম্পত্তির হিসেবও দিতে হয়। তাঁর অভিযোগ, ২০১৬ সালে নির্বাচনের আগে তিনি জানতে পারেন, 'জিসিআর' নামের একটি কোম্পানি খুলেছেন তাঁর স্ত্রী। জি ফর গোপাল, সি ফর চিকু এবং আর ফর রত্না। শোভনবাবু বলেন, চিকুর ভাল নাম অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল রত্নার কাছে। শোভনের দাবি, এই অভিজিতের সঙ্গেই সম্পর্ক রয়েছে রত্নার। জেনে ফেলতেই রত্না নাকি বলেছিলেন, "বেশ করছি প্রেম করছি। না পোষালে ডিভোর্স দিয়ে দাও।" শোভন বলেন, সেদিনই ঠিক করি, "অনেক হয়েছে, আর না।"
শোভন এ দিন বলেন, বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, রত্নাদেবী ছক করছেন সুপারি কিলার দিয়ে বৈশাখী এবং তাঁর মেয়েকে শেষ করে দেওয়ার। জন্মদিনে বিষ মেশানো কেক পাঠানো হতে পারে তাও নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে জানিয়েছিলেন বলেও জানান 'এখনও মেয়র' শোভন।
গোলপার্কের বাড়ি থেকে শোভনের এই সাক্ষাৎকারের পর, পর্ণশ্রীর বাড়ি থেকে পাল্টা বিস্ফোরণ ঘটান রত্না। বলেন, "তৃণমূল থেকে আমাকে বলেছিল আমি যেন মুখ না খুলি। কিন্তু এ সব শুনে আর চুপ থাকা যায় না। আমার ঘেন্না হচ্ছে এরকম একটা মিথ্যেবাদী নোংরা লোকের সঙ্গে আমি বাইশ বছর সংসার করেছি। আগে বলেছিলাম, মতি ফিরলে যদি ঘরে ফেরে তাহলে মেনে নেব। কিন্তু এখন আর সে সব ভাবছি না।"
আরও পড়ুন: মমতাদি-কে চল্লিশ বছর ধরে চিনি, তাঁকে মানি, কিন্তু বৈশাখীকে নিয়ে আপোস নয়: শোভন
রত্নার দাবি, "বৈশাখীর সঙ্গে ওর সম্পর্ক জানাজানি হওয়ায় এখন আমার সঙ্গে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়-এর নাম জড়াচ্ছে।" রত্না এ-ও বলেন, এক মহিলা বাউন্সার তাঁকে বলেছিলেন, বৈশাখী তাঁকে মারার পরিকল্পনা করেছেন। এবং এ কথা পর্ণশ্রী থানার ওসি-কে রত্না জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন। জন্মদিনে ছেলে-মেয়ের হাত দিয়ে বিষ মেশানো কেক পাঠানো নিয়ে বলেন, "৭জুলাই শোভনের জন্মদিনে আমার ছেলে-মেয়ে গেছিল। গাড়ির বনেটে রেখে কেক কাটার ছবি আছে। ওরাও কেক খেয়েছিল। কই ওরা তো মরেনি!"
শোভনের সঙ্গে বৈশাখীর সম্পর্কের পর এ বার নতুন উপাদান রত্নার সঙ্গে চিকু। সেই সঙ্গে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের অভিযোগ। মহানগরে মহানাগরিকের মেগা কলহ এ বার নতুন মাত্রা পেল এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।