দ্য ওয়াল ব্যুরো: দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমন্ডির কাঠের মুখোশের খ্যাতি রাজ্য, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছিল গত কয়েক বছরে। কিন্তু এবার লকডাউনে মুখ থুবড়ে পড়েছে এই মুখোশ-শিল্প। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে চলা করোনা পরিস্থিতিতে মুখোশ তৈরির শিল্পীরা পড়েছেন চরম আতান্তরে। বাজার বন্ধ, চাহিদা নেই। বায়না মিলছে না একেবারেই। যেন পড়ে থেকে থেকে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে মুখোশগুলো। ফলে ঐতিহ্যপূর্ণ এই হস্তশিল্প ছেড়ে, কুশমণ্ডির শিল্পীরা বাধ্য হয়ে যোগ দিচ্ছেন কৃষি কাজে। বিশ্বের দরবারে প্রসিদ্ধ এই মুখোশ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এই প্রজন্মের যুব-শিল্পীরাও।
দক্ষিণ দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী গোমিরা নৃত্যের জন্য মূলত তৈরি হয় মুখোশগুলি। জানা য়ায়, রাজবংশীদের দেশী ও পোলি সম্প্রদায়ের বিদ্বেষমূলক আচরণের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল গোমিরা নৃত্যচর্চা। গোমিরা নৃত্যে দুটি চরিত্র "বুড়া-বুড়ি" যা শিব ও পার্বতী রূপে মানা হয়। নৃত্যশিল্পীরা নাচেন কাঠের মুখোশ পরে। গ্রামাঞ্চলে ফসল কাটার মরসুমে 'অশুভ শক্তি' তাড়াতেও এই মুখোশের ব্যবহার হয়। সবমিলিয়ে কুশমণ্ডি এলাকার রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে এই কাঠের মুখোশগুলি ঐতিহ্যগতভাবে উপাসনা এবং নিষ্ঠার বস্তু।

কুশমণ্ডি ব্লকের মহিষবাথান, উষাহরণ, বেরাইল, দেহাবন্দ ইত্যাদি গ্রাম ঐতিহ্যবাহী মুখোশের জন্য বিখ্যাত। একটি কাঠের পিণ্ডকে ছেনি হাতুড়ি দিয়ে কেটে শিল্পীরা তৈরি করেন মুখোশ। এমনকি বাঁশ কেটেও তৈরি করা হয় নানান মুখোশ ও কারুকার্য। ঐতিহ্যবাহী প্রথা ধরে রাখার পাশাপাশি হস্তশিল্পকে তুলে ধরতে তৈরি হয় মহিষবাথান গ্রামীণ হস্তশিল্প সমবায় সমিতিও। মাত্র ২৭ জন শিল্পী নিয়ে পথা চলা শুরু হয়েছিল সেটির। পরে হস্তশিল্পকেই সকলে জীবিকা হিসেবে বেছে নেন। পরে সেই সংখ্যা ৫০০ ছাড়ায়। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে মুখোশের খ্যাতি। তৈরি হয় তিন তলা বিল্ডিং, পর্যটকদের জন্যও শিল্পকলা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়।
একটা সময় এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষ পেট চালানোর জন্য ভিন্ রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে চলে যেতেন। তবে বিশ্বের বাজারে এই শিল্প বিশেষ খ্যাতি অর্জন করায় ফের একবার নতুন প্রজন্ম এই শিল্পমুখী হয়।

২০১১ সালে রাজ্যে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরে প্রাচীন এই শিল্পকলাকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ শুরু হয় সরকারি ভাবে। নেওয়া হয় একগুচ্ছ পরিকল্পনাও। রাজ্য সরকারের তরফে শিল্পীদের দেওয়া হয় পরিচয় পত্র। ২০১৩ সাল থেকে শিল্পকলাগুলি জনসমক্ষে তুলে ধরতে রাজ্য সরকার ও বাংলা নাটক ডট কম 'মুখা মেলা'র আয়োজন করে। এছাড়াও বিশ্ববাজারে শিল্পীদের কাজ তুলে ধরার ব্যবস্থা করে বাংলা নাটক ডট কম। জেলার শিল্পীরা তাদের তৈরি মুখোশ নিয়ে যায় কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাইয়ের বিভিন্ন মেলায়। এমনকি বছর ছয়েক আগে দক্ষিণ দিনাজপুরের মুখোশ শিল্পী শংকর দাস তার শিল্পকলা নিয়ে পাড়ি দেন লন্ডনেও।
কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে ফের সমস্যায় পড়েছে মহিষবাথানের মুখোশ শিল্পীরা। নানা মেলা ও বাজার বন্ধ থাকায় বিক্রি হচ্ছে না মুখোশ। নতুন করে বায়না বা অর্ডার দিচ্ছেন না ক্রেতারাও। ফলে এক প্রকার কাজ বন্ধ তাঁদের। লকডাউনে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল মহিষবাথান গ্রামীণ হস্তশিল্প সমবায় সমিতিও। গত ২ রা জুলাই থেকে ফের কাজ শুরু হলেও শিল্পীর সংখ্যা হাতেগোনা। অর্ডার না থাকায় ঢিমেতালে চলছে কাজ।

কুশমণ্ডির মুখোশশিল্পী লটাই চন্দ্র সরকার জানাচ্ছিলেন, করোনা পরিস্থিতির জন্য কাজ প্রায় বন্ধ। উপার্জনের জন্য কৃষিকাজে হাত লাগাচ্ছেন তাই। তাঁর কথায়, "এখানে কাজ শিখেছি। এখন করোনা পরিস্থিতির জন্য কাজ প্রায় বন্ধ। অর্ডার পেলে কাজ করছি, মেলা আর করা হচ্ছে না। সংসার চলে না, তাই চাষ করছি।"
আর এক শিল্পী কল্যাণ চন্দ্র সরকার জানান, আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ নিয়ে গেছেন, বিভিন্ন জায়গায় তাঁর মুখোশ প্রদর্শনী করা ও বিক্রি করার ব্যবস্থাও হয়েছে। কিন্তু এখন সংকটে তাঁর কাজ। তাঁর কথায়, "৮০০ থেকে ৮০০০ টাকায় বিভিন্ন মাপের মুখোশ বিক্রি করেছি। বাংলা নাটক ডট কমের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের অর্ডার আসত। কিন্তু বর্তমানে লকডাউন পরিস্থিতিতে সব বন্ধ। ফলে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা কাজে এসেও ফিরে যাচ্ছে।"