
শেষ আপডেট: 6 December 2020 14:17
বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল বৈঠকে শিশিরবাবুকে উদ্দেশ্য করে পূর্ব মেদিনীপুরে দলের সংগঠন অটুট রাখার কথা বলেছিলেন দিদি। এ-ও বলেছিলেন, নন্দীগ্রাম ও হলদিয়ার ব্লক সভাপতি বদল করে দিতে। নেত্রীর সেই নির্দেশ মতো, নন্দীগ্রাম ও হলদিয়ার ব্লক সভাপতি শনিবারই বদলে দিয়েছেন শিশিরবাবু। সেই সঙ্গে আরও দুই ব্লক সভাপতি বদলে দেওয়া হয়েছে।
মেদিনীপুরের জেলা রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা অনেকে মনে করছেন, শিশিরবাবু শারীরিক কারণে সোমবারের সভায় অনুপস্থিত থাকলেও তা তাৎপর্যপূর্ণ বইকি। তবে সে ছাড়াও কালকের সভায় অনেক কিছু দেখার রয়েছে। দুই মেদিনীপুরের কত জন বিধায়ক, ব্লক সভাপতি সোমবারের সভায় উপস্থিত থাকেন সেও দেখার।
শিশিরবাবুর মেজ ছেলে তথা শুভেন্দু অধিকারী বর্তমানে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য রাজনৈতিক ব্যক্তি। গত প্রায় এক মাস ধরে তাঁকে ঘিরেই অধিকাংশ আলোচনা আবর্তিত হচ্ছে। সূত্রের মতে, গত মঙ্গলবার শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠকে সৌগত রায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়রা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন মেদিনীপুরের সভায় যেন তিনি উপস্থিত থাকেন। কিন্তু বৈঠকের সমস্ত আলোচনা সৌগতবাবু হাটখোলা করে দেওয়ায় পরের দিনই জবাব দিয়ে দেন শুভেন্দু। তিনি জানিয়ে দেন, একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়।
ঘটনা হল, শুভেন্দুর সঙ্গে ওই বৈঠকের আগেই মেদিনীপুরের বৈঠকের দিনক্ষণ স্থির হয়েছিল। ২৭ নভেম্বর শুভেন্দু মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিতেই দিদির নির্দেশে পরদিন কাকভোরে মেদিনীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। তিনিই এই জনসভার আয়োজন করেছেন। সূত্রের খবর, ২৮ তারিখ পশ্চিম মেদিনীপুরের সমস্ত ব্লক সভাপতি ও বিধায়কের সঙ্গে বৈঠকে তিনি পইপই করে বলেছেন, দলে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। সবাই যেন দলীয় প্রতীকের সঙ্গে থাকেন।
তবে শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, লোকসভা ভোটের পর এই সুব্রত বক্সীকেই পশ্চিম মেদিনীপুরের পর্যবেক্ষক করা হয়েছিল। কিন্তু বক্সীবাবু তখন শুভেন্দুকে বলেছিলেন, "জেলাটা তুই দেখে দে ভাই।" এমনিতে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় শুভেন্দুকে দল নির্বিশেষে সব থেকে দাপুটে নেতা বলে অনেকেই মনে করেন। পশ্চিম মেদিনীপুরে তাঁর প্রভাব অসামান্য বলে তাঁদের মত। ফলে কালকের সভায় দুই মেদিনীপুর মিলিয়ে তৃণমূলের সমস্ত ব্লক সভাপতি ও বিধায়ককে সুব্রত বক্সী উপস্থিত করাতে পারবেন কিনা সেটাও কিন্তু চ্যালেঞ্জ।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, শুভেন্দুও হয়তো কৌশলগত ভাবে মমতার সভার আগে দল ছাড়েননি। কারণ এক, তিনি হয়তো দেখতে চান দিদি কী বলছেন। এবং দুই, এখনও পর্যন্ত দল ও সরকারের সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনও কথা না বলে রহস্য রেখে দিয়েছেন তিনি। ফলে অনেকের পক্ষে আঁচ করা সম্ভব হচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধে কতটা বলবেন ও কী বলবেন।
বাম জমানায় রাজনৈতিক ভাবে শিশিরবাবুর প্রভাব মোটামুটি ভাবে কাঁথি, এগরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আগে থেকেই শুভেন্দু গোটা মেদিনীপুরে ক্রমশ তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে সম্ভব হয়েছেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের তিন বছর আগে ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটেই লক্ষ্মণ শেঠকে যথেষ্ট বেগ দিয়েছিলেন এই দাপুটে নেতা। সে বার লোকসভা ভোটে তৃণমূলের একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতেছিলেন। লক্ষ্মণ শেঠের কাছে শুভেন্দু পরাস্ত হয়েছিলেন মাত্র ৪০ হাজার ভোটে।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন পরবর্তী সময়ে শুধু দুই মেদিনীপুর নয়, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম সহ গোটা জঙ্গলমহলে শুভেন্দু দায়িত্ব নিয়ে তৃণমূলের সংগঠন তৈরি করেছিলেন। সেই সময়ে তাঁর উপর মাওবাদী হামলার হুমকিও ছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পর্যন্ত শুভেন্দুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে থাকতেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, ইদানীং কাল রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল তথা জঙ্গলমহলে শুভেন্দুর মতো গ্রহণযোগ্য নেতা তৈরি হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও জঙ্গলমহলের সাংগঠনিক বিষয়ে তাঁর উপরে নির্ভর করতেন।
সেই শুভেন্দু তৃণমূল ছাড়তে পারেন, এই প্রেক্ষাপটেই কাল সোমবার মেদিনীপুরে সভা মমতার। এ ধরনের ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবর আগ্রাসী এবং সম্মুখ সমরে বিশ্বাসী। চোখে চোখ রেখে লড়াই করাই তাঁর রাজনৈতিক চরিত্র। শুভেন্দুর রাজনৈতিক চরিত্রেও তা ভিন্ন নয়। ফলে বলা যেতে পারে একুশের ভোটের আগে মাইলফলক হয়ে উঠতে চলেছে মেদিনীপুর। সুপ্রাচীন যে জনপদ অতীতেও বহু লড়াইয়ের সাক্ষী।