দ্য ওয়াল ব্যুরো : প্রায় প্রতিদিনই রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় টুইট করে বা অন্যভাবে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন। পাল্টা জবাব দেয় রাজ্য সরকারও। কিন্তু বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের আগে ব্যাপারটা গুরুতর আকার নিয়েছে। অধিবেশনের শুরুতে রাজ্যপাল সাধারণত মন্ত্রিসভার অনুমোদিত ভাষণ পাঠ করেন। কিন্তু এবার বেঁকে বসেছেন রাজ্যপাল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অনড়। তিনি বলছেন, রাজ্যপালের কথা শুনে ভাষণের একটি শব্দও বদলানো হবে না। প্রাক্তন আইনজীবী রাজ্যপাল বলছেন, ভাষণে অসাংবিধানিক কিছু থাকলে রাজ্যপাল চিহ্নিত করতেই পারেন।
গতবছরেও রাজ্যপাল ভাষণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভাষণে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলা ছিল। কথাগুলো রাজ্যপালের মনঃপুত হয়নি। নিয়মরক্ষার খাতিরে তিনি সেই ভাষণ পাঠ করেছিলেন বটে, কিন্তু বিধানসভা থেকে বেরিয়েই টুইট করেছিলেন। তাতে লিখেছিলেন, ভাষণে এনআরসি নিয়ে যে অংশটি ছিল, তার সঙ্গে তিনি একমত নন।
এবার রাজ্যপাল আরও কড়া অবস্থান নিয়েছেন। আগেই বলেছিলেন, যথেষ্ট সময় থাকতে তাঁর কাছে ভাষণের কপি পাঠাতে হবে। তিনি আগেভাগে পড়ে দেখবেন কী লেখা আছে। ভাষণ নিয়ে আলোচনার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজভবনে ডেকেছিলেন। কিন্তু মমতা যাননি। তিনি বলেছেন, রাজ্য সরকার রাজ্যপালের ক্রীতদাস নয়। তিনি নিজের সুবিধামতো সময়ে ডাকলেই যে যেতে হবে এমন কথা নেই। পরে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, রাজ্যপাল ডাকলে তিনি চা খেতে যাবেন। তা বলে ভাষণ নিয়ে আলোচনা করবেন না। ধনকড়ের ভাষণের কোন অংশ নিয়ে আপত্তি, সেখানে কী বলা আছে, দু-পক্ষের কেউই তা খোলসা করেননি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের কারও কারও অনুমান, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা ভোটে নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় সরকার, আধা সেনা এবং স্বয়ং রাজ্যপালের ভূমিকা নিয়ে অস্বস্তিকর বক্তব্য ভাষণে যুক্ত করা হয়ে থাকতে পারে।
ভাষণ নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে রাজ্যপালের এমন বিরোধ সচরাচর হয় না। কেন্দ্রে যদি বিরোধী দলের সরকার থাকে, তাহলে রাজ্য সরকার প্রায়ই অভিযোগ করে, রাজ্যপাল নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়েছেন। কেন্দ্রের হয়ে কাজ করছেন। কিন্তু বিধানসভার ভাষণ নিয়ে এমন বিরোধ বিরল ঘটনা। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এমন উদাহরণ বড় জোর দু'-তিনটে খুঁজে বার করা যায়।
২০২০ সালের শুরুতে দেশে যখন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তুঙ্গে তখন এইরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল কেরলে। জানুয়ারিতে কেরল বিধানসভা অধিবেশন ছিল। রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খান সাফ বলেন, তাঁকে যে ভাষণটি দেওয়া হয়েছে, তার ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফটি পড়তে পারবেন না। ওই প্যারায় লেখা ছিল, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের অফিস থেকে তাঁকে বলা হয়, কেন্দ্রীয় সরকার বনাম বাসবাইয়া চৌধুরির মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছিল, সেই অনুযায়ী রাজ্যপাল ওই ভাষণ পড়তে বাধ্য।
রাজ্যপাল পাল্টা বলেন, তাঁর দায়িত্ব হল মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ অনুযায়ী সরকারের নানা নীতি ও কর্মসূচি সম্পর্কে বিধানসভার সদস্যদের অবহিত করা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায় অথবা সংবিধানের ১৭৬ (১) ধারায় বলা হয়নি যে, রাজ্য সরকার যদি তার এক্তিয়ার বহির্ভূত কোনও ব্যাপারে মতামত দেয়, রাজ্যপালকে তা বিধানসভায় পড়ে শোনাতে হবে।
বিজয়ন সরকার অবশ্য রাজ্যপালের যুক্তি কানে তোলেনি। মুখ্যমন্ত্রীর অফিস থেকে তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাঁকে মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদিত ভাষণই পড়তে হবে। রাজ্যপাল অবশ্য ভাষণের বিতর্কিত অংশ পাঠ করেননি। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। বিধানসভার নথিতে থেকে গিয়েছে যে, রাজ্যপাল ভাষণ পাঠ করেছেন। নিয়ম হল, রাজ্যপাল যদি পুরো ভাষণ না পড়েন, এমনকি মাত্র দু'লাইন পড়ে ছেড়ে দেন, বিধানসভা ধরে নেবে, তিনি পুরো ভাষণই পাঠ করেছেন। সুতরাং ভাষণের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ নিয়ে রাজ্যপাল যে আপত্তি করেছিলেন, সরকারিভাবে তা কোথাও উল্লেখ করা নেই।
পশ্চিমবঙ্গে এখনকার প্রজন্মের খুব কম ছেলেমেয়েই রাজ্যপাল ধরমবীরের কথা জানে। অথচ ছ'য়ের দশকের শেষের দিকে রাজ্য রাজনীতিতে তিনি ছিলেন একেবারে ঝড়ের কেন্দ্রে।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল অবধি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন ধরমবীর। তখন রাজ্যের পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। ১৯৬৬ সালে রাজ্য জুড়ে খাদ্য আন্দোলন হয়েছিল। তার পরিণতিতে '৬৭-র ভোটে হেরে যায় কংগ্রেস। বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৈরি হয় যুক্তফ্রন্ট সরকার।
কংগ্রেসি আমলের শেষ দিকে রাজ্যে চালের দর হয়েছিল আগুন। মানুষ আশা করতেছিল, যুক্তফ্রন্ট চালের দর কমাবে।
যুক্তফ্রন্টের খাদ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন প্রফুল্ল ঘোষ। তিনি বরাবরের কংগ্রেসি। কিন্তু প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অতুল্য ঘোষের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না বলে দল ছেড়ে আসেন। খাদ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি চালের দাম কমাতে ব্যর্থ হলেন। চালের দর কংগ্রেসি আমলকেও ছাপিয়ে গেল। সিপিএম একবাক্যে বলল, এই ব্যর্থতার জন্য প্রফুল্ল ঘোষই দায়ী। এমনকি একদিন কাঁথিতে এক সভায় সিপিএম সমর্থকরা প্রফুল্ল ঘোষকে ধাক্কাধাক্কি করেছিল বলে শোনা যায়।
ক্ষোভে প্রফুল্লবাবু তাঁর কয়েকজন অনুগামীকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট ছাড়লেন। ধরমবীর তখন অজয় মুখোপাধ্যায়কে ডেকে বললেন, বিধানসভায় গরিষ্ঠতার প্রমাণ দিন। যুক্তফ্রন্ট নানা টালবাহানা করতে লাগল। রাজ্যপাল কয়েকমাস অপেক্ষা করে শেষে সরকার ভেঙে দিলেন। ফলে বামপন্থীদের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন ভিলেন। সেই সময় বাম দলগুলির সমর্থকরা রোজ রাজভবনের চারপাশে মিছিল করে স্লোগান দিত, 'ধরমবীরের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও'।
'৬৯ সালে ফের ভোট হল পশ্চিমবঙ্গে। বাড়তি শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় এল যুক্তফ্রন্ট। মুখ্যমন্ত্রী হলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। বিধানসভার অধিবেশনের শুরুতে রাজ্যপালকে যে ভাষণটি পড়তে দেওয়া হল, তাতে লেখা, আগের যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করা ভুল হয়েছিল।
অর্থাৎ রাজ্যপালকে বলা হল, তিনি ভাষণে বলবেন, আগের সরকারকে ভেঙে দিয়ে ধরমবীর ভুল করেছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই আপত্তি জানালেন রাজ্যপাল। ধরমবীর কি পড়েছিলেন সেদিন ভাষণের ওই অংশ। ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথা বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের দাবি, ধরমবীর ভাষণের ওই অংশ পাঠ করেননি। আবার কারও কারও বক্তব্য, অধিবেশন কক্ষে পাঠ করুন বা না করুন, ধরেই নিতে হবে তিনি পড়েছেন। কারণ, রাজ্যপালের ভাষণ হিসাবেই তা বিধানসভায় নথিভুক্ত থেকে গিয়েছে।
এবারও বিধানসভার ভাষণ নিয়ে রাজ্যপাল ও সরকারের বিরোধ যে জায়গায় পৌঁছেছে, সেখান থেকে ফেরার আর রাস্তা নেই। কোনও পক্ষই সমঝোতা চায় না। এবারও কি রাজ্যপাল বাধ্য হয়ে মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদিত ভাষণ পড়বেন? নাকি জগদীপ ধনখড় 'অন্য কোনও' পদক্ষেপ নেবেন? এই প্রশ্নের জবাব মিলবে শুক্রবার।